মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

সদ্যপ্রাপ্ত

>> নিউইয়র্কে ড. ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় ব্যবস্থা নেবে সরকার

>> রাস্তা বন্ধ থাকায় ঘর ভেঙে মরদেহ নিয়ে গেলেন এলাকাবাসী

>> নিরাপত্তার কারণে কারাগারে রেখেই জিয়াউল আহসানের বিচার

>> নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে ড. ইউনূসকে ঘিরে বিক্ষোভ, হেনস্তার অভিযোগ

>> এনসিটির ইজারা চুক্তি বাতিলের দাবিতে চট্টগ্রাম বন্দরে গণঅনশন

>> নারায়ণগঞ্জে অবৈধ গ্যাস সংযোগের অভিযোগ, তিতাস কর্মকর্তা আজাদ ও ঠিকাদারদের ঘিরে প্রশ্ন

>> রবীন্দ্রনাথ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিতর্কে জামায়াতকে ঘিরে রাশেদ খাঁনের অভিযোগ

>> পাঁচ ধাপে ইউপি নির্বাচন, ভোট শুরু ২১ জানুয়ারি

>> জি এম কাদেরের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ, গ্রেপ্তারের দাবি

>> পরকীয়ার অভিযোগে প্রবাসীর স্ত্রীকে গাছে বেঁধে নির্যাতন, চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগ

আপনি পড়ছেন : অর্থনীতি

জ্বালানি তেল থেকে ১০ বছরে সরকার পেয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা


Rabeya ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:৪২



জ্বালানি তেল থেকে ১০ বছরে সরকার পেয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা


গত এক দশকে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপিসির মুনাফা থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ অর্থ পেয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে জ্বালানি তেল আমদানির বিপরীতে সরকারকে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা শুল্ক ও কর দিয়েছে সংস্থাটি।

এর পাশাপাশি ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত এক দশকে বিপিসির নিট মুনাফা হয়েছে ৫৩ হাজার ১৩২ কোটি টাকা। শুল্ক-কর ও মুনাফা—দুই হিসাব মিলিয়ে গত এক দশকে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা।

এই অর্থের মূল উৎস ছিল ভোক্তাদের কাছে জ্বালানি তেল বিক্রি থেকে পাওয়া আয়।

আমদানির পর্যায়ে একক পণ্য হিসেবে সরকারের সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আসে ডিজেল থেকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ অর্থবছরে শুধু ডিজেল আমদানির বিপরীতেই বিপিসি সরকারকে ১১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা শুল্ক ও কর দিয়েছে।

দাম বাড়লেও কমেনি প্রশ্ন

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে জ্বালানি তেলের দাম কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে। গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। পরে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলের দাম আরও ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে কেরোসিনের দাম ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বিপিসির আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে দামের পার্থক্যের কারণে পাচারের ঝুঁকি—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে দাম সমন্বয় করা হয়েছে।

তবে দাম বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি তেলের ওপর আরোপিত শুল্ক-কর কমানোর সুযোগ ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

আগের বছরগুলোতে বিপিসির মুনাফা

বিপিসির নিরীক্ষিত হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে শুধু ২০২১-২২ অর্থবছরে সংস্থাটি লোকসান করেছে। ওই বছর লোকসানের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা। বাকি বছরগুলোতে বিপিসি মুনাফা করেছে।

তবে সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে বিপিসির লোকসান হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। নিরীক্ষিত হিসাব প্রকাশ না হলেও প্রাথমিক হিসাবে বলা হয়েছে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে তেল কিনে দেশে নিয়ন্ত্রিত মূল্যে বিক্রি করায় প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে।

বিপিসির বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতে অর্জিত মুনাফার পুরো অর্থ বর্তমানে সংস্থাটির হাতে নেই। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত মুনাফার প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্প ও পরিচালন ব্যয়েও অর্থ ব্যয় হয়েছে।

আমদানিতে বাড়ছে আর্থিক চাপ

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ মার্চ সংস্থাটির হাতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা ছিল। এরপর জ্বালানি আমদানির বিলসহ বিভিন্ন দায় পরিশোধ করতে হয়েছে। কিছু অর্থ দুর্বল ব্যাংকে আটকে রয়েছে এবং কিছু অর্থ বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য সংরক্ষিত।

বর্তমানে জ্বালানি আমদানিতে ব্যবহারযোগ্য অর্থ প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা। ৪০টি ঋণপত্রের অর্থের ব্যবস্থা করতে গিয়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হতে পারে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

ডিজেলের প্রকৃত খরচ কত?

চলতি মাসে বিপিসি প্রায় ১৩ কোটি ১৩ লাখ লিটার ডিজেল খালাস করেছে। সংশ্লিষ্ট কাস্টমস তথ্য অনুযায়ী, বন্দরে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতি লিটার ডিজেলের গড় আমদানি ব্যয় ছিল ১২৬ টাকা ৪১ পয়সা।

এর সঙ্গে প্রায় ৩৩ টাকা শুল্ক ও কর যোগ হলে ব্যয় দাঁড়ায় ১৫৯ টাকা ৪১ পয়সা। এরপর বন্দর থেকে ভোক্তা পর্যায়ে পরিবহন, পরিচালন ব্যয়, ডিলার কমিশন ও উন্নয়ন তহবিলসহ আরও প্রায় ১৭ টাকা ২৭ পয়সা যুক্ত হয়। সব মিলিয়ে প্রতি লিটারে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১৭৬ টাকা ৬৮ পয়সা।

বর্তমান ১৩৫ টাকা বিক্রয়মূল্য ধরে এই হিসাব অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ৪২ টাকা ঘাটতি থাকছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা শুল্ক ও কর। শুল্ক-কর বাদ দিলে আমদানি ও অন্যান্য ব্যয়ের তুলনায় ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৯ টাকা।

তবে বিপিসির চেয়ারম্যানের হিসাবে আন্তর্জাতিক বাজারদর, শুল্ক-কর ও অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের মোট ব্যয় প্রায় ২০৫ টাকা। এর আগে ১১৫ টাকা দরে ডিজেল বিক্রি করায় প্রতি লিটারে প্রায় ৯০ টাকা ঘাটতি হচ্ছিল বলে তিনি জানান। নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পরও তাঁর হিসাবে প্রতি লিটারে ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৭০ টাকা।

সরকারি কোষাগারে জমা মুনাফা নিয়ে আলোচনা

গত এক দশকে বিপিসির মুনাফার প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে। এখন আর্থিক চাপের মুখে সংস্থাটি সরকারের কাছ থেকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি পাওয়ার আশা করছে।

বিপিসির চেয়ারম্যানের ভাষ্য, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে প্রয়োজনীয় ভর্তুকির পরিমাণ কিছুটা কমবে। পাশাপাশি জ্বালানি বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ ভবিষ্যতে নতুন তেল আমদানির অর্থায়নে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

শুল্ক-কর কমানোর সুযোগ ছিল কি?

জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে শুল্ক ও কর কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যেত কি না, সেটিও আলোচনায় এসেছে।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাঁর দাবি, সুযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর কমানোর উদ্যোগ নিত।

অন্যদিকে নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, বিপিসির অতীত মুনাফার একটি অংশ সংকটের সময়ে সংস্থাটিকে ফিরিয়ে দিলে ভোক্তার ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমানো যেত।

তাঁর মতে, বিপিসিকে মূলত সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘না লাভ, না ক্ষতি’ কাঠামোয় পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানের স্বাধীন নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।

কারণ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার মাধ্যমে কৃষি, শিল্প ও পণ্য সরবরাহের খরচও বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর।