বুড়িগঙ্গা নদীর দুই পাড়ে ডিঙিনৌকায় যাত্রী পারাপারকারী মাঝিদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘাটভেদে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে তাঁদের। এর মধ্যে কোনো কোনো মাঝিকে দুই পাড়ে যাত্রী ওঠানোর জন্য আলাদা করে টাকা দিতে হয়।
মাঝিদের ভাষ্য, বছরের পর বছর ধরে ঘাটকেন্দ্রিক এই টাকা আদায় চলে আসছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে টাকা আদায়কারীদের পরিবর্তন হলেও বন্ধ হয়নি এই প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তথ্য অনুযায়ী, বুড়িগঙ্গার ফতুল্লা থেকে কেরানীগঞ্জের জিনজিরা টিনপট্টিঘাট পর্যন্ত মোট ১৭টি ঘাট রয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি ঘাটের ৪৪টি স্থান থেকে ডিঙিনৌকায় যাত্রী পারাপার করা হয়। এসব ঘাট বিআইডব্লিউটিএ ইজারা দিয়ে থাকে।
তবে সংস্থাটির ট্যারিফ শিডিউলে ডিঙিনৌকা থেকে নির্দিষ্ট হারে টাকা আদায়ের কোনো বিধান নেই। অন্যান্য নৌযানের জন্য নির্ধারিত ফি থাকলেও ডিঙিনৌকার ক্ষেত্রে এমন কোনো ফি উল্লেখ করা হয়নি।
বিভিন্ন ঘাটে গিয়ে মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘাটভেদে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। কেরানীগঞ্জের ধোপাঘাট থেকে যাত্রী তুললে দৈনিক ১০০ টাকা এবং বাদামতলী থেকে যাত্রী তুললে ৫০ টাকা দিতে হয়। দুই দিক থেকে যাত্রী তুললে মোট ১৫০ টাকা দিতে হয়। এ ছাড়া নৌকা পাহারার নামে আরও ১৫ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মাঝিরা জানান, তাঁদের দৈনিক আয় সাধারণত ৭০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে। এর মধ্য থেকে নৌকার ভাড়া, ঘাটের টাকা ও অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়ার পর হাতে খুব বেশি অর্থ থাকে না। ফলে অনেক মাঝি দুই ঘাট থেকে যাত্রী না তুলে একটি ঘাট থেকেই যাত্রী নিয়ে থাকেন।
ঘাটের টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হয়রানি কিংবা মারধরের শিকার হওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন মাঝি। তাঁদের দাবি, নির্দিষ্ট ফি না থাকায় ইজারাদারদের ইচ্ছামতো টাকা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সদরঘাটের আশপাশের কয়েকটি ঘাটেও যাত্রীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও প্রবেশের সময়, আবার কোথাও বের হওয়ার সময়ও অর্থ দিতে হয়। অথচ বিআইডব্লিউটিএর নির্ধারিত ট্যারিফের সঙ্গে আদায় করা অর্থের পার্থক্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কেরানীগঞ্জের এক নিয়মিত যাত্রী বলেন, প্রতিদিন নদী পারাপারের সময় ঘাটে নানা ধরনের টাকা দিতে হয়। এ নিয়ে ঘাটের লোকজনের সঙ্গে যাত্রীদের প্রায়ই কথা-কাটাকাটি হয়।
বিআইডব্লিউটিএর একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডিঙিনৌকায় যাত্রী পারাপারের জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট ফি ট্যারিফ শিডিউলে নেই। তবে দীর্ঘদিন ধরে মাঝি ও ইজারাদারদের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে একটি অর্থ নির্ধারণ করে নৌকা চালানো হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
এদিকে মাঝিদের অভিযোগ, বুড়িগঙ্গায় নৌকা চালালেও তাঁদের অনেকের নিজস্ব নৌকা নেই। ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায় একটি ডিঙিনৌকা কেনা সম্ভব হলেও প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণের কারণে সাধারণ মাঝিদের নৌকা কেনার সুযোগ সীমিত। কেউ নৌকা কিনলে সেটি চুরি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
মাঝিদের ভাষ্য অনুযায়ী, অল্প দামের একটি নৌকা থেকেও নিয়মিত আয় হয়। ফলে স্থানীয় প্রভাবশালীদের অনেকে একাধিক নৌকার মালিক হয়ে আছেন।
বুড়িগঙ্গা পার হয়ে প্রতিদিন ব্যবসা, চাকরি ও বিভিন্ন প্রয়োজনে হাজারো মানুষ পুরান ঢাকা ও কেরানীগঞ্জের মধ্যে যাতায়াত করেন। সেতুপথে যেতে হলে অনেকটা ঘুরতে হয় বলে স্বল্প খরচে দ্রুত পারাপারের জন্য ডিঙিনৌকার ওপর নির্ভর করেন তাঁরা। ফলে ঘাটকেন্দ্রিক অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়টি যাত্রী ও মাঝি—উভয়ের ওপরই বাড়তি চাপ তৈরি করছে।