সন্তান একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। মা-বাবা নিজেদের সবটুকু ভালোবাসা, যত্ন ও স্বপ্ন দিয়ে সন্তানকে বড় করে তোলেন। সেই সন্তান অল্প বয়সে নির্মমভাবে প্রাণ হারালে পরিবারটির ওপর যে শোক নেমে আসে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
কুমিল্লার শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনাও এমনই এক হৃদয়বিদারক প্রশ্ন সামনে এনেছে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে কেন তাঁকে এভাবে প্রাণ হারাতে হলো? একটি আইফোনকে কেন্দ্র করে যদি এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকে, তাহলে এর পেছনে থাকা সামাজিক বাস্তবতা আরও গভীরভাবে ভাবার দাবি রাখে।
অপ্রতিমের মা-বাবা এখন সন্তানকে হারিয়ে কীভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন—এ প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই। একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন ও আনন্দ যেন মুহূর্তেই থমকে গেছে।
বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের জীবনেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের জ্ঞান ও যোগাযোগের সুযোগ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অপরাধপ্রবণ কনটেন্ট, মাদক ও নেতিবাচক বন্ধুত্বের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।
অনেক পরিবারেই দেখা যায়, মা-বাবা ও সন্তান একই ঘরে থেকেও নিজেদের মধ্যে পর্যাপ্ত সময় কাটাচ্ছেন না। অভিভাবকেরা ব্যস্ত থাকছেন নিজেদের কাজে বা মোবাইল ফোনে, আর শিশুরাও দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে কাটাচ্ছে। বয়স ও মানসিক পরিপক্বতা অনুযায়ী সঠিক দিকনির্দেশনা না পেলে এ পরিস্থিতি তাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনা তাই শুধু একটি পরিবারের শোকের বিষয় নয়; এটি শিশুদের নিরাপত্তা, পারিবারিক বন্ধন, মাদক, অপরাধ এবং সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে কোনো অপরাধের দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে আবেগের পাশাপাশি তদন্ত ও প্রমাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। অপ্রতিমকে কারা হত্যা করেছে, কেন করেছে এবং এর পেছনে কী কারণ ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে।
একই সঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্বও রয়েছে শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, মাদকের বিস্তার রোধ, শিশুদের জন্য নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ এবং পরিবারে সচেতনতা—সবগুলো বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
শিশু-কিশোরদের শুধু প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখাই সমাধান নয়। বরং প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার শেখানো, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা এবং তারা কার সঙ্গে মিশছে ও কী ধরনের পরিবেশে সময় কাটাচ্ছে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা প্রয়োজন।
অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের জন্য একটি বেদনাদায়ক সতর্কবার্তা। একটি শিশুর জীবন যেন আর কোনো লোভ, অপরাধ, মাদক বা সামাজিক অবক্ষয়ের কাছে হারিয়ে না যায়—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
এমন শোকের দিনে অপ্রতিমের পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানানোই মানবিক দায়িত্ব। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা পারিবারিক অতীতের কারণে একটি শিশুর নির্মম মৃত্যুকে ন্যায্যতা দেওয়ার সুযোগ নেই। একটি শিশুর জীবন সবার ঊর্ধ্বে।