মোটরসাইকেল চালানো ও যাতায়াতের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার জন্য হেলমেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাজারে বিক্রি হওয়া সব হেলমেট নিরাপদ নয়। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)–এর সাম্প্রতিক পরীক্ষায় আমদানি করা হেলমেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নির্ধারিত নিরাপত্তামান পূরণ করতে পারেনি।
রাজধানীর বাংলামোটরসহ বিভিন্ন এলাকার হেলমেটের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে বিভিন্ন দামের হেলমেট বিক্রি হচ্ছে। আমদানি করা হেলমেটের দাম প্রায় আড়াই হাজার থেকে শুরু করে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে দেশীয়ভাবে তৈরি কিছু হেলমেট তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়।
বাজারে এমন কিছু হেলমেটও রয়েছে, যেগুলোর দাম মাত্র কয়েকশ টাকা। এগুলোর অনেকগুলো মূলত পাতলা প্লাস্টিকের তৈরি এবং যথাযথ নিরাপত্তা সুরক্ষা দিতে সক্ষম কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক মোটরসাইকেলচালক শুধু আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে এসব হেলমেট ব্যবহার করেন।
রাইড শেয়ারিং অ্যাপে মোটরসাইকেল চালানো আরিফুজ্জামান শাওনের ভাষ্য, পুলিশ হেলমেট না পরলে মামলা করে। তাই অনেক চালক হেলমেট ব্যবহার করেন। যাত্রীরাও অনেক সময় হেলমেট পরতে চান না বলে চালকেরা তুলনামূলক হালকা হেলমেট রাখেন।
বাজারে ভারতীয় হেলমেটের পাশাপাশি চীন, স্পেন ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের হেলমেট পাওয়া যায়। মান ও ব্র্যান্ডভেদে এসব হেলমেটের দামে বড় পার্থক্য রয়েছে। আমদানি করা হেলমেট বাজারজাত করার আগে বিএসটিআইয়ের নির্ধারিত নিরাপত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক।
তবে বিএসটিআইয়ের গত ছয় মাসের পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, পরীক্ষা করা ৪৯টি হেলমেটের মধ্যে ৩৭টি নির্ধারিত মান পূরণ করেছে। বাকি ১২টি পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়েছে। অর্থাৎ পরীক্ষিত হেলমেটের প্রায় ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ মান পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।
হেলমেট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ভালকানের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, তাদের সব হেলমেট বিএসটিআই অনুমোদিত এবং আমদানির সময় সংস্থাটির নির্ধারিত শর্ত অনুসরণ করা হয়।
বিএসটিআইয়ের নিয়ম অনুযায়ী, মোটরসাইকেল আরোহীদের ব্যবহারের হেলমেটসহ নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে মান পরীক্ষার সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক। আমদানিকারককে নির্দিষ্ট মডেলের নমুনা বিএসটিআইয়ের পরীক্ষাগারে জমা দিতে হয়। পরীক্ষায় নির্ধারিত মান পূরণ করলে তবেই সেটি বাজারজাতের অনুমতি পায়।
পরীক্ষার সময় হেলমেট আঘাত শোষণ করতে কতটা সক্ষম, ধারালো বা শক্ত বস্তুর আঘাতে তা কতটা সুরক্ষা দিতে পারে এবং বিভিন্ন পরিবেশে এর কার্যকারিতা কেমন থাকে—এসব বিষয় যাচাই করা হয়। বেশি ও কম তাপমাত্রা, অতিবেগুনি রশ্মি এবং পানি বা বৃষ্টির সংস্পর্শের পরও হেলমেটের সক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়।
এ ছাড়া হেলমেটের ওজন, আকার, চাপ ও ঘর্ষণ সহনশীলতা, পানি ও তাপ সহনশীলতা, ভিজরের কার্যকারিতা এবং মাথায় আটকে রাখার স্ট্র্যাপের সক্ষমতাও পরীক্ষার আওতায় থাকে। সব ধাপে নির্ধারিত মান পূরণ করলেই বিএসটিআইয়ের সনদ দেওয়া হয়।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু হেলমেট পরলেই হবে না; সেটি মানসম্মত ও নিরাপত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কি না, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। মানহীন হেলমেটের ব্যবহার বন্ধ করতে আমদানি, উৎপাদন ও বাজারজাত—সব পর্যায়েই কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৬৬ লাখ। এর মধ্যে মোটরসাইকেল রয়েছে প্রায় ৪৮ লাখ ৭১ হাজার, যা মোট নিবন্ধিত যানবাহনের প্রায় ৭৪ শতাংশ।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৩ হাজার ২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭২ জন নিহত হয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৬ শতাংশই ছিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাজনিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় চালক ও আরোহীর সুরক্ষায় মানসম্মত হেলমেটের বিকল্প নেই। তাই হেলমেট কেনার সময় শুধু দাম বা বাহ্যিক আকৃতি নয়, বিএসটিআইয়ের মানচিহ্ন ও অনুমোদন রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি।