উত্তরের পাঁচ জেলা রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও কুড়িগ্রামে তিস্তা নদীর ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ভাঙন ঠেকাতে জিও ব্যাগ ও বালুর বস্তা ফেলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত দিনে এসব জেলার ৩৮৬টি ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবীব জানিয়েছেন, পাঁচ জেলার ১১৩টি পয়েন্টে তিস্তার ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ভাঙন প্রতিরোধে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় কার্যকরভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিস্তার তীব্র স্রোত ও নদীভাঙনে প্রতিদিনই বসতভিটা হারাচ্ছেন নদীতীরবর্তী মানুষ। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই নদীগর্ভে সব হারাচ্ছে। ফলে ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোতে আতঙ্ক বাড়ছে।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের সিংগীজানী ও ভোরের পাখি এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ভাঙন আরও তীব্র হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক দিন ধরে নদীতে স্রোতের চাপ বাড়ছিল। পরে হঠাৎ করে তীরের মাটি ধসে পড়তে শুরু করলে অল্প সময়ের মধ্যেই বেশ কয়েকটি ঘরবাড়ি নদীতে চলে যায়।
ভুক্তভোগীরা জানান, আকস্মিক ভাঙনের কারণে অনেক পরিবার ঘরের আসবাব, ধান-চাল, কাপড় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী বের করে নিতে পারেনি। দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে যারা একাধিকবার বসতি পরিবর্তন করেছেন, তাদের অনেকেই এবার শেষ আশ্রয়টুকুও হারিয়েছেন।
সুন্দরগঞ্জের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঈফফাত জাহান তুলি। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তাদের পরিস্থিতির খোঁজ নেন এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানান, ভাঙনপ্রবণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুড়িগ্রামের উলিপুর ও রাজারহাট উপজেলাতেও তিস্তার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। গত সাত দিনে এই দুই উপজেলায় প্রায় ৮০টি ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বসতভিটা হারিয়ে গবাদিপশু ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলাতেই তিস্তার ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানি বাড়া-কমার সঙ্গে সঙ্গে কোথাও কোথাও ভাঙনের তীব্রতাও বাড়ছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল রায় জানান, কয়েকটি এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। তবে স্থায়ীভাবে ভাঙন ঠেকাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না থাকায় বড় ধরনের প্রতিরোধমূলক কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।
রংপুরের পীরগাছা, কাউনিয়া ও গঙ্গাচড়া উপজেলাতেও একই পরিস্থিতি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজ উদ্দিনের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত দিনে এই তিন উপজেলায় ৫৩টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই ত্রাণের পাশাপাশি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
নীলফামারীর ভাঙনকবলিত এলাকাতেও বহু পরিবার ঘর হারিয়ে খোলা জায়গা, বাঁধ কিংবা স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। অনেকের রান্না ও খাবারেরও ব্যবস্থা নেই। জরুরি ভিত্তিতে তাঁবু ও শুকনা খাবারের প্রয়োজন রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত চর খরিবাড়ির বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, কয়েক দফা নদীভাঙনের পর কোনোভাবে নতুন জায়গায় বসতি গড়েছিলেন। এবার সেই ঘরও তিস্তার ভাঙনে চলে গেছে। পরিবার নিয়ে কোথায় থাকবেন, তা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
এদিকে তিস্তার ভাঙন মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। তাঁর মতে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া স্থায়ীভাবে ভাঙন ও নদীঘেঁষা মানুষের দুর্ভোগ কমানো কঠিন। তিনি জানান, ২০২৭ সালের শুরুতেই নিজস্ব অর্থায়নে হলেও প্রকল্পটির কাজ শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে।