প্রতিদিনের মতো সেদিনও দুই মেয়েকে বিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন সুনীল কান্তি দাশ। বারান্দায় বসে মেয়েদের বিদায় জানানোর পর অপেক্ষা করছিলেন কখন তারা আবার বাড়ি ফিরবে। কিন্তু সেই অপেক্ষা আর পূরণ হয়নি। ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছোট মেয়ে ঈশা রানী দাশকে (১২) সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন তিনি।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা ইউনিয়নের মিঠার দোকান এলাকার নাথপাড়ায় এখন শোকের পরিবেশ। মেয়ের মৃত্যুর পর ভেঙে পড়েছেন ঈশার বাবা সুনীল কান্তি দাশ (৫২) ও মা উষা রানী দাশ। দীর্ঘদিন ওমানে থাকার পর স্ট্রোক করে গত বছর দেশে ফেরেন সুনীল। তাঁর এক পা পুরোপুরি অসাড়, অন্য পায়েও তেমন শক্তি নেই। চলাফেরা করতে না পারায় দিনের বেশির ভাগ সময় বাড়িতেই কাটে তাঁর।
ঈশা পড়ত ছদাহার কেফায়েত উল্লাহ কবির আহমদ উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে। তার বড় বোন আদিত্যা রানী দাশ (১৬) একই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। দুই বোন প্রতিদিন একসঙ্গে স্কুলে যেত এবং একসঙ্গেই বাড়ি ফিরত।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার দিন বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় ঈশা বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে গিয়েছিল। তবে সেই খাবার আর খাওয়া হয়নি। শিঙাড়া ছিল তার পছন্দের খাবার। তাই টিফিনের বিরতিতে বিদ্যালয়ের কাছের একটি দোকান থেকে শিঙাড়া কিনতে বের হয় সে।
বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে মহাসড়ক পার হওয়ার সময় চট্টগ্রামমুখী একটি বাস ঈশাকে ধাক্কা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে তাকে চট্টগ্রাম নগরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে তার মৃত্যু হয়।
ঈশার মা উষা রানী দাশ বলেন, স্কুলে যাওয়ার আগে ও স্কুল থেকে ফিরে মেয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরত। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে গেলেও মেয়েকে আর জীবিত অবস্থায় বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে পারেননি তিনি।
ঈশার চাচা স্বপন কান্তি দাশ স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি জানান, অসুস্থ হয়ে সুনীল প্রবাস থেকে দেশে ফেরার পর পরিবারটিতে আর্থিক সংকট দেখা দেয়। তারপরও দুই মেয়ের পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়, সে বিষয়ে সুনীল সবসময় চেষ্টা করেছেন। মেয়েরা লেখাপড়া করে প্রতিষ্ঠিত হবে—এটাই ছিল তাঁর স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের মাঝেই এক মেয়েকে দুর্ঘটনায় হারাতে হলো।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আতিকুর রহমান জানান, দুপুরের বিরতির সময় ঈশা স্কুল থেকে বের হয়েছিল। এ সময় স্টার লাইন পরিবহনের একটি বাস তাকে ধাক্কা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি।
এদিকে ঈশার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভ দেখা দেয় শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। দুর্ঘটনার প্রতিবাদে তারা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক প্রায় আড়াই ঘণ্টা অবরোধ করে রাখে। এ সময় দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বাসটিতেও ভাঙচুর চালানো হয়।
ঈশার মৃত্যুর পর পরিবারটির সামনে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। পক্ষাঘাতে আক্রান্ত বাবার পাশে মায়ের কান্না আর বড় বোনের শোক—সব মিলিয়ে নাথপাড়ার বাড়িটিতে নেমে এসেছে গভীর বিষাদ।