তীব্র বৃষ্টি আর নাব্যতা সংকটে সন্দ্বীপ চ্যানেলে আটকে যায় একটি ফেরি। ফলে স্বাভাবিক সময়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টায় শেষ হওয়ার কথা থাকা যাত্রা শেষ করতে সময় লেগেছে প্রায় ১৯ ঘণ্টা। রাতভর ফেরিতে আটকা পড়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন প্রায় ৩০০ যাত্রী।
বুধবার দুপুর ৩টার দিকে সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে বাসে রওনা হন ৫৫ বছর বয়সী জোলেখা খানম। স্বাভাবিক সময়ের মতো কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চট্টগ্রামের হালিশহরের বাসায় পৌঁছানোর কথা ছিল তাঁর। কিন্তু বাসটি ফেরিতে ওঠার পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
জানা যায়, বুধবার বিকেল ৪টার দিকে ফেরি ছাড়ার কথা থাকলেও ‘কপোতাক্ষ’ নামের ফেরিটি গুপ্তছড়া ঘাট থেকে সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ঘাটের উদ্দেশে রওনা দেয় সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে। যাত্রা শুরুর প্রায় ১০ মিনিট পরই সন্দ্বীপ চ্যানেলের পলিমাটিতে ফেরিটি আটকে যায়।
ফেরিতে দুটি যাত্রীবাহী বাস, সাতটি ছোট-বড় ট্রাক এবং কয়েকটি ব্যক্তিগত যানবাহন ছিল। কর্মকর্তাদের হিসাবে যাত্রীর সংখ্যা প্রায় ১০০ হলেও একাধিক যাত্রীর দাবি, সেখানে প্রায় ৩০০ মানুষ ছিলেন।
জোলেখা খানম জানান, ফেরি আটকে যাওয়ার পর চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়। এর মধ্যে শুরু হয় বৃষ্টি। পরে জানতে পারেন, পলিমাটিতে আটকে গেছে ফেরিটি। পুরো রাত উৎকণ্ঠার মধ্যে ফেরিতেই কাটাতে হয় তাঁকে।
জোলেখার সঙ্গে বাসে ছিলেন তাঁর ভাই মো. শরীফুল ইসলাম। তিনি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। ফেরি আটকে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর ইঞ্জিন বন্ধ করে দেওয়া হলে পুরো ফেরি অন্ধকার হয়ে যায়। এতে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে যাত্রীদের আপত্তির পর প্রায় এক ঘণ্টা পর ইঞ্জিন আবার চালু করা হয়।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অসুস্থ ভাইকে নিয়ে জোলেখার দুশ্চিন্তাও বাড়তে থাকে। তাঁর ভাষ্য, তিনি পুরো রাত এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমাতে পারেননি। রাত প্রায় ৩টার দিকে জোয়ারের পানিতে ফেরিটি নড়াচড়া শুরু করলে যাত্রীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, আবহাওয়া সতর্কতার কারণে এর আগে টানা চার দিন ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। বুধবার সন্ধ্যায় ফেরি চলাচল শুরু হলেও কিছুদূর যাওয়ার পর কাদায় আটকে যায় কপোতাক্ষ। পরে জোয়ার এলে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ফেরিটি বাঁশবাড়িয়া ঘাটে পৌঁছায়।
এরপর জোলেখা ও অন্য যাত্রীরা বাসে করে গন্তব্যের দিকে রওনা হন। শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তিনি চট্টগ্রামের হালিশহরের বাসায় পৌঁছান। অর্থাৎ বুধবার বিকেলে শুরু করা যাত্রা শেষ করতে তাঁর প্রায় ১৯ ঘণ্টা সময় লাগে।
এদিকে দীর্ঘ সময় ফেরিতে আটকে থাকার সুযোগে ক্যানটিনে খাবার ও পানির দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। জোলেখার অভিযোগ, যাত্রাটি স্বাভাবিকভাবে অল্প সময়ের হওয়ার কথা থাকায় অধিকাংশ যাত্রীর কাছে পর্যাপ্ত খাবার ছিল না। সেই সুযোগে ক্যানটিনে কিছু খাবার দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ দামে বিক্রি করা হয়। তবে রাতে স্থানীয় বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে যাত্রীদের জন্য খাদ্যসহায়তাও আসে।
ফেরি আটকে যাওয়ার ঘটনায় মাস্টারের গাফিলতিকে দায়ী করেছেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) উপপরিচালক ও পোর্ট অফিসার নয়ন শীল। তাঁর মতে, উপকূলীয় রুটে জোয়ার-ভাটার সময় বিবেচনা করে ফেরি চলাচলের সময় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সেটি যথাযথভাবে করা হয়নি বলে তিনি জানান।
ফেরির মাস্টার সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোনে সাড়া দেননি। পরে মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে ফেরির ক্যানটিনে অতিরিক্ত দামে খাবার ও পানি বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে সন্দ্বীপের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন জানান, ফেরি আটকে পড়ার খবর পেয়ে তিনি রাতেই সেখানে যান। তবে সে সময় যাত্রীরা তাঁর কাছে অতিরিক্ত দামের অভিযোগ করেননি। লিখিত বা সরাসরি অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।