বর্ষা এলেই রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন সড়কে দেখা দেয় গর্ত, খানাখন্দ ও ভাঙন। কোথাও পিচ উঠে সড়ক এবড়োখেবড়ো হয়ে গেছে, আবার কোথাও দীর্ঘদিন ধরে সড়ক কেটে রাখার পরও মেরামত করা হয়নি। ফলে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পথচারীদেরও দুর্ভোগ বাড়ছে।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়নকাজের জন্য সড়ক কাটার পর যথাসময়ে মেরামত না করাও সড়কের দুরবস্থার অন্যতম কারণ। অনেক জায়গায় সংস্কারকাজ ধীরগতিতে চলায় মাসের পর মাস ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকার কারণে বর্ষাকালে সড়ক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা কাটা, কাজ শেষ হওয়ার পর দ্রুত মেরামত না করা এবং সংস্কারকাজে দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক এলাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া, মিরপুর, আগারগাঁও, শ্যামলী, গুলশান, বনানী, মহাখালী, বাড্ডা, কুড়িল, খিলক্ষেতসহ উত্তর সিটির বিভিন্ন এলাকার সড়কে ছোট-বড় গর্ত ও ভাঙন দেখা গেছে। একই চিত্র দক্ষিণ সিটির বকশীবাজার, লালবাগ, চকবাজার, বংশাল, সূত্রাপুর, যাত্রাবাড়ী, জুরাইন, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, হাতিরপুল, খিলগাঁও ও গেন্ডারিয়ার বিভিন্ন সড়কেও।
প্রগতি সরণির কুড়িল থেকে নর্দ্দা বাজার বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার অংশে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। কোথাও সড়ক দেবে গেছে, কোথাও আবার বৃষ্টির পানিতে গর্তের গভীরতা বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে। এসব গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে যানবাহনের গতি কমছে এবং যানজটও বাড়ছে।
বিভিন্ন সড়কে উন্নয়নকাজের জন্য কেটে রাখা অংশও দীর্ঘদিন ধরে মেরামত না করায় দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে। মিরপুর-১ থেকে টেকনিক্যাল মোড়ের পথে ফুটপাতসংলগ্ন একটি অংশ ছয় মাসের বেশি আগে কাটা হলেও সেটি এখনো পুরোপুরি সংস্কার হয়নি। একইভাবে মোহাম্মদপুর ও লালমাটিয়ার কয়েকটি সড়কেও দীর্ঘদিন ধরে কাটার চিহ্ন রয়েছে।
দক্ষিণ সিটির অতীশ দীপঙ্কর সড়কের একটি অংশও দীর্ঘদিন ধরে ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে। বাসাবো, মাদারটেক ও নন্দীপাড়া এলাকার কয়েকটি সড়কে সংস্কারকাজ চললেও ধীরগতির কারণে যানবাহন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
গেন্ডারিয়া থেকে জুরাইন রেলগেটের দিকে যাওয়ার সড়কের কয়েকটি স্থানে এক থেকে দেড় ফুট গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে। গর্তের কারণে দুর্ঘটনা এড়াতে কোথাও কোথাও বাঁশের খুঁটি দিয়ে সতর্কসংকেত দেওয়া হয়েছে। পাশের কয়েকটি সড়কেও ভাঙন ও নোংরা পানি জমে থাকার চিত্র দেখা গেছে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন প্রতিবছর সড়ক, নালা ও ফুটপাত উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। ঢাকা উত্তর সিটির প্রায় ১ হাজার ৫৬০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে চলতি অর্থবছরে পুরোনো ও নতুন ওয়ার্ড মিলিয়ে প্রায় ৪৬০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার বা নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটিতে সড়ক, নালা ও ফুটপাত উন্নয়নে প্রায় ৩১৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায়ও আরও বিভিন্ন সড়ক ও নালার কাজ হয়েছে। চলতি অর্থবছরে সড়ক, নালা ও ফুটপাত নির্মাণে প্রায় ৫৬৮ কোটি টাকা এবং বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচিতে আরও প্রায় ৫৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মোট সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ৫৫৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ১২০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার বা নির্মাণ প্রয়োজন। গত অর্থবছরে সেখানে প্রায় ৫০ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে সড়ক, নালা ও ফুটপাত নির্মাণে প্রায় ২৬৬ কোটি টাকা এবং বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচিতে ১১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটির প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্ষায় অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে সড়কে গর্ত ও ফাটল তৈরি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো নিয়মিত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে প্রতিদিন রাতে অ্যাসফল্ট মিশ্রণ ব্যবহার করে গর্ত ও খানাখন্দ মেরামত করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৃষ্টি ও দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকার কারণে অনেক সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে সংস্কারের কাজ চলছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় সব সড়ক একসঙ্গে সংস্কার করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও জরুরি সড়কগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তবে নগরবাসীর প্রশ্ন, প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় ও বরাদ্দের পরও কেন বর্ষা এলেই রাজধানীর সড়কে একই ধরনের গর্ত, ভাঙন ও জলাবদ্ধতা ফিরে আসে। তাঁদের মতে, টেকসই সংস্কারের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়নকাজের মধ্যে সমন্বয় এবং কাজ শেষে দ্রুত রাস্তা মেরামত নিশ্চিত করা জরুরি।