ঢাকা বন বিভাগের আওতাধীন বিভিন্ন বিটে সংরক্ষিত বনভূমি দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, গাছ কাটা এবং উচ্ছেদ অভিযানের পর পুনরায় জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের সঙ্গে বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ থাকার অভিযোগও করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ঢাকা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) বশিরুলসহ কয়েকজন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পর কিছুদিনের মধ্যেই আবার দখল শুরু হচ্ছে। কোথাও বসতঘর ও দোকান নির্মাণ, কোথাও কারখানা বা গুদাম স্থাপন এবং কোথাও বনভূমির গাছ কেটে রাস্তা তৈরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ অনুযায়ী, চন্দ্রা স্পিনিং মিলসংলগ্ন কারিগরপাড়া এলাকায় আশরাফ হোসেন নামের এক ব্যক্তি ইটের দেয়াল দিয়ে চার কক্ষের একটি আধাপাকা ভবন নির্মাণ করছেন। চন্দ্রা টাওয়েল টেক্সের পাশের সংরক্ষিত বনভূমিতে আকাশমণি গাছ কেটে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে তৌহিদুল ইসলাম সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছিল। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি আবারও রাস্তার কাজ শুরু করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে মামলার বর্তমান অবস্থা এবং নির্মাণকাজের বৈধতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
কালিয়াকৈরের ভুলুয়া, কালামপুর, কুঁচপাড়া, বটতলা ও চান্দরা এলাকার বিভিন্ন স্থানে বনভূমিতে বাড়ি, দোকান ও গুদাম নির্মাণের অভিযোগও পাওয়া গেছে। কয়েকজন ব্যক্তি বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের অর্থ দিয়ে এসব স্থাপনা নির্মাণ করেছেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। অভিযোগে বিভিন্ন অঙ্কের অর্থ লেনদেনের কথা বলা হলেও সেসব লেনদেনের স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চন্দ্রা বিটের কয়েকটি এলাকায় অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে সহায়তার বিনিময়ে অর্থ নেওয়া হয়েছে। শিল্প কুঞ্জ পার্কের কাছে দোকান নির্মাণ এবং সকিনার মোড়ে একাধিক কক্ষের ঘর তৈরির ঘটনাতেও বিট কর্মকর্তা ও অন্য কর্মীদের নাম এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু স্থাপনার সামান্য অংশ ভেঙে অভিযান পরিচালনার বিষয়টি দেখানো হলেও মূল স্থাপনাগুলো রয়ে গেছে। চান্দরা খেলার মাঠের পাশে একাধিক কক্ষের স্থাপনা নির্মাণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া মাটিকাটা এলাকার একটি কারখানার কাছে এবং ভুলুয়া মৌজায় বনভূমিতে বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। এসব স্থাপনা বনভূমির সীমানার মধ্যে পড়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সরকারি জরিপ ও ভূমির নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
মৌচাক বন বিটের ভান্নারা সাব-বিটে বনফুল বাজার এলাকায় নতুন করে ৩৪টি অবৈধ দোকান নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিটি দোকানের বিপরীতে অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
আলিফ কম্পোজিট লিমিটেড নামের একটি কারখানার বিরুদ্ধে বনভূমি দখলের অভিযোগও করা হয়েছে। উচ্ছেদ ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট বিট কর্মকর্তার মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। মাঝুখান মৌজায় গজারি ও আকাশমণি গাছ কাটার অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয়রা।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, বিট কর্মকর্তা এবং বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
শ্রীপুর রেঞ্জের রাথুরা বিটে সরকারি জমি থেকে গজারি গাছ কাটার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত ৪ জুন সিএস ১৩৬৯ ও ১৩৭১ দাগের জমি থেকে মোজাম্মেল নামের এক ব্যক্তির কাছে ১০টি গজারি গাছ বিক্রি করা হয়। এ ঘটনায় বিট কর্মকর্তা শেখ ইমদাদ হোসেনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর তাঁকে সিলেটে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি একই এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বদলির আদেশ বাস্তবায়নের অবস্থা এবং গাছ কাটার ঘটনায় কোনো বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে কি না, তা সরকারি নথি থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এ ছাড়া বেলতলী ও কবরঘাটা এলাকায় বনভূমিতে ঘর নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে।
কাশিমপুর বিটের মাধবপুর এলাকায় বনভূমিতে দুই কক্ষের একটি আধাপাকা ঘর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে ইমরান নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বিট কর্মকর্তা চান মিয়ার সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের নিশ্চিন্তপুরে আউলিয়ার টেক মাজারের সামনে বনভূমির গাছপালা কেটে পিচঢালাই রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। এ কাজের সঙ্গে একজন প্রভাবশালী ঠিকাদারের সংশ্লিষ্টতার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে রাস্তা নির্মাণের অনুমোদন, জমির শ্রেণি এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
মৌচাক বিটের ভান্নারা মৌজায় বনভূমি পুনর্দখলের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৩ সালে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৪ কোটি টাকা মূল্যের জমির একটি বড় অংশ উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেখানে কাঁটাতারের বেড়া ও খুঁটি কেটে আবারও স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে।
বনপ্রহরীদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে রাতে পুনর্দখলে সহযোগিতা করার অভিযোগ করা হয়েছে। সরকারি সার্ভেয়ার সরেজমিনে জমি পরিমাপ করে দখলের তথ্য পেয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে পরিমাপের প্রতিবেদন, জমির সীমানা এবং পরবর্তী সময়ে উচ্ছেদ না হওয়ার কারণ সম্পর্কে বন বিভাগের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রয়োজন।
বাড়ইপাড়া বন বিট এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবেদনে শাহ আলম নামের এক ব্যক্তির বক্তব্যের উল্লেখ রয়েছে, যেখানে তিনি বনভূমিতে ঘর নির্মাণের জন্য বিট অফিসে অর্থ দেওয়ার কথা বলেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। আশরাফ নামের আরেক ব্যক্তির বিরুদ্ধেও বনভূমিতে পাকা বাড়ি নির্মাণ এবং বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ রয়েছে।
এ ধরনের বক্তব্যের মূল ভিডিও বা অডিও, বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট এবং সংশ্লিষ্ট জমির সরকারি রেকর্ড যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ সহজ হবে।
অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, ঢাকা বন বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় বনভূমি দখল, গাছ কাটা এবং অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের ঘটনাগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
তাঁরা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন