সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন ভিডিও ও বিভ্রান্তিকর তথ্য। এর মধ্যে এক নারীর শিরশ্ছেদের ভিডিওকে ওই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য বলে প্রচার করা হচ্ছে। তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটি ২০১৫ সালে সৌদি আরবে এক নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পুরোনো দৃশ্য।
ভিডিওতে দেখা যায়, কালো বোরকা পরা এক নারীকে ঘিরে রেখেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন সদস্য। তাঁদের মধ্যে সাদা পোশাক পরা এক ব্যক্তির হাতে রয়েছে তলোয়ার। ওই নারী নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আরবি ভাষায় চিৎকার করছেন। একপর্যায়ে তাঁকে মাটিতে শুইয়ে তলোয়ার দিয়ে শিরশ্ছেদ করা হয়।
গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশের পর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ভিডিওটির কয়েকটি স্থিরচিত্র ব্যবহার করে অনুসন্ধান চালালে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
যুক্তরাজ্যের মিডল ইস্ট আই ও ডেইলি মেইল, ইসরায়েলের টাইমস অব ইসরায়েল এবং পাকিস্তানের ডন-এর প্রতিবেদনে সৌদি কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, ওই নারীর নাম লায়লা বিনতে আবদুল মুত্তালিব বাসিম। তিনি মিয়ানমারের নাগরিক ছিলেন এবং সৌদি আরবে বসবাস করতেন। সৌদি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল, তিনি তাঁর স্বামীর ছয় বছর বয়সী মেয়েকে নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের পর হত্যা করেছিলেন। আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
অর্থাৎ, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২০১৫ সালের পুরোনো ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে।
গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের সরকারি সংবাদ সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ করে।
এরপর ১৫ অক্টোবর জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে কূটনৈতিক পত্র পাঠিয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে চায়। পরবর্তী সময়ে ১৮ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছেও বিষয়টি নিয়ে আরেকটি কূটনৈতিক পত্র দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের বরাতে জানা যায়, সৌদি আরবে বাংলাদেশি বন্দীদের বিষয়ে নিয়মিত তথ্য পাঠানো হলেও ওই দুই ব্যক্তির শাস্তির বিষয়টি কেন আগে জানানো হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ। তাঁদের মামলার বিস্তারিত বিবরণ, বিচারিক প্রক্রিয়ায় নেওয়া পদক্ষেপ এবং দণ্ডিত হওয়ার পর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, সেসব তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের আগস্টে গ্রেপ্তারের পর দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। নিম্ন আদালত তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে ১৩ বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত আপিল আদালতের প্যানেল সেই রায় বহাল রাখেন। আদালতের রায় অনুসারে নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক সেলে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে সৌদি পক্ষ জানিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিও ও ছবিতে দাবি করা হচ্ছে, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মরদেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে এ দাবিরও সত্যতা পাওয়া যায়নি।
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপপরিচালক শরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তির মরদেহ তখনো দেশে আসেনি।
যাচাইয়ে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কফিন বহনের ছবিটি অন্য এক প্রবাসীর মরদেহ দেশে ফেরার সময় তোলা। চলতি বছরের ৯ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার মুরাদ শেখের মরদেহ দেশে ফেরার একই ছবি পাওয়া যায়।
ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মুরাদ শেখের মরদেহ সৌদি আরব থেকে দেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দর থেকে তাঁর গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। পরে জানাজা শেষে তাঁকে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়।
অর্থাৎ, মুরাদ শেখের মরদেহ দেশে আনার সময়কার ছবিকে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মরদেহ দেশে ফেরার ছবি বলে প্রচার করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী ও পুরুষের ছবি দিয়ে তৈরি একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হচ্ছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি স্বামী-স্ত্রী ছিলেন। তাঁরা হানিমুনের পরিবর্তে ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন বলেও প্রচার করা হচ্ছে।
তবে প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য কোনো সংবাদমাধ্যমে তাঁদের স্বামী-স্ত্রী হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
নজরুল ইসলামের বাবা আবদুল বাছির জানিয়েছেন, তাঁর ছেলে অবিবাহিত ছিলেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নারীর সঙ্গে তাঁর ছেলের সম্পর্কের বিষয়েও তাঁরা কিছু জানতেন না।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে যান নজরুল ইসলাম। মক্কার হারাম শরিফে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় আট মাস পর দেশটির পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পরে প্রায় তিন বছর তিনি কারাগারে ছিলেন।
নজরুলের পরিবার জানায়, গ্রেপ্তারের প্রায় এক মাস পর তাঁরা তাঁর আটকের খবর জানতে পারেন। কারাগার থেকে মাঝেমধ্যে মা-বাবার সঙ্গে অল্প সময়ের জন্য কথা বলার সুযোগ পেতেন তিনি। পরিবারের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয় ১১ অক্টোবর। এর কয়েক দিন পর সৌদি আরব থেকে ফোন করে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানানো হয়।
ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠাতে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তাঁর বাবা আবদুল বাছির। তিনি সরকারের কাছে ছেলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন।
নজরুলের মা রহিমা বেগমও শেষবারের মতো ছেলের মরদেহ দেখতে চান বলে জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি দাবি যাচাইয়ে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। পুরোনো শিরশ্ছেদের ভিডিও, অন্য এক প্রবাসীর মরদেহ দেশে ফেরার ছবি এবং দুই ব্যক্তির সম্পর্ক নিয়ে ছড়ানো তথ্যের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।