বাংলাদেশে গত পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে বজ্রপাতে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড, বজ্রপাত, ভূমিকম্প ও পাহাড়ধস—এই ছয় ধরনের দুর্যোগে মোট ২ হাজার ৫৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৫৩০ জনই মারা গেছেন বজ্রপাতে, যা মোট প্রাণহানির প্রায় ৬০ শতাংশ। অন্যদিকে, আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে সবচেয়ে বড় দুর্যোগ ছিল বন্যা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ‘দুর্যোগের ধরন, ক্ষয়ক্ষতি ও অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত ৬ অক্টোবর সংসদীয় কমিটির বৈঠকে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। এতে বজ্রপাতকে দুর্যোগ মোকাবিলার অগ্রাধিকার তালিকায় প্রথম স্থানে রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরে বজ্রপাতের পর সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে অগ্নিকাণ্ডে। এ ঘটনায় মারা গেছেন ৬৫৪ জন। একই সময়ে দেশে ১ লাখ ২৪ হাজার ৪৮৬টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
এ ছাড়া নয়টি বড় বন্যায় ১৯৭ জন, পাহাড়ধসে ৯০ জন, ছয়টি ঘূর্ণিঝড়ে ৫২ জন এবং ভূমিকম্পে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ বছরে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড, বজ্রপাত ও ভূমিকম্পে মোট ৪৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ সর্বোচ্চ ২৯ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা।
ঘূর্ণিঝড়ে ১১ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা, অগ্নিকাণ্ডে ২ হাজার ২০ কোটি টাকা, ভূমিকম্পে ১০৮ কোটি টাকা এবং বজ্রপাতে ১০৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে বজ্রপাতকে সরকারি দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয় ২০১৬ সালে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটলেও উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে সিলেট এলাকায় এর প্রবণতা বেশি। উত্তরাঞ্চলেও তুলনামূলকভাবে বজ্রপাতের ঘটনা বেশি ঘটে। বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ কৃষক।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে বজ্রপাতের প্রবণতা কম থাকে। মার্চ থেকে তা বাড়তে শুরু করে এবং এপ্রিলে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়। মে মাসে বজ্রপাতের প্রবণতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর জুন ও জুলাইয়ে তা কমলেও সেপ্টেম্বরে আবার কিছুটা বাড়তে দেখা যায়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা মনে করেন, বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে শুধু সচেতনতামূলক প্রচার যথেষ্ট নয়। মাঠপর্যায়ে মানুষের বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
তাঁর মতে, বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তিদের অনেকেই দরিদ্র কৃষক। বৃষ্টির সময়ও জীবিকার প্রয়োজনে তাঁদের মাঠে কাজ করতে হয়। তাই কৃষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠ ও বাড়ির সুরক্ষাব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট প্রটোকল তৈরি করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বজ্রপাতে মানুষের পাশাপাশি গবাদিপশুরও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়। দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনায় এই ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। পাশাপাশি গাছ কাটা বন্ধ করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবসম্মত নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বজ্রপাতজনিত প্রাণহানি কমাতে আগাম সতর্কবার্তা, জনসচেতনতা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। বিশেষ করে কৃষক ও খোলা মাঠে কাজ করা মানুষের নিরাপত্তায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।