ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বর্তমান আইনি মর্যাদা কী—এ নিয়ে জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া কূটনৈতিক ও আইনি উদ্যোগের অগ্রগতিও জানতে চাওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কমিটির সদস্য এস কে আজিজুল বারী শেখ হাসিনা ভারতে ঠিক কোন ধরনের স্ট্যাটাসে অবস্থান করছেন, তা জানতে চান। পাশাপাশি তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে রয়েছে, সে বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়।
বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানান, প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরাতে অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে দুই দফায় আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে।
তবে শেখ হাসিনা ভারতে ঠিক কোন আইনি বা প্রশাসনিক মর্যাদায় অবস্থান করছেন, সে বিষয়ে বৈঠকে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। এর আগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও তার ভারতে অবস্থানের সুনির্দিষ্ট স্ট্যাটাস সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না থাকার কথা প্রকাশ্যে এসেছে।
অন্যদিকে, সম্প্রতি ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী জানিয়েছেন, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে একটি আইনগত ও সুসংগঠিত প্রক্রিয়া চলছে। ওই প্রক্রিয়ার সঙ্গে আদালতও যুক্ত থাকায় তাকে ফেরানোর বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা বলা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।
বৈঠকে শহীদ ওসমান হাদি হত্যা মামলার এক অভিযুক্তকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও আলোচনা হয়। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেওয়া পদক্ষেপের অগ্রগতি জানতে চান এস কে আজিজুল বারী।
জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ওই অভিযুক্তকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ভারতের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। প্রয়োজনীয় আদালতের পরোয়ানাও ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকায় তাকে ফেরানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
বৈঠকে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদের সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেপ্তার ও পরে জামিন পাওয়ার বিষয়টিও উঠে আসে। তার জামিনের বিষয়ে ইউএই সরকারের কাছে কোনো ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে কি না, জানতে চান কমিটির সদস্য।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এ বিষয়ে ইউএই সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করার জন্য একটি লিগ্যাল ফার্মও নিয়োগ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি ও দাপ্তরিক নথি ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
বৈঠকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য দূতাবাস ও কনস্যুলেটের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। বিশেষ করে নারী কর্মী ও শিক্ষার্থীদের জরুরি সহায়তা, অভিযোগ গ্রহণ এবং সেগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রবাসীদের জন্য একটি পৃথক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা অ্যাপ চালুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়। জরুরি হটলাইনে যোগাযোগকারীদের তথ্যের গোপনীয়তা এবং অভিযোগের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে কেস-ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়।
স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অবৈধ অভিবাসন, মানব পাচার, জাল ভিসা ও ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহারের বিষয়ও গুরুত্ব পায়। নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার, দেশে ফেরত আনা ও পুনর্বাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
বৈঠকে দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়। সংকট সমাধানে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখার কথা জানানো হয়।
একই সঙ্গে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়েও আলোচনা হয়। দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকে পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।