ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, দলিল নিবন্ধনে অনিয়ম এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। তাঁর সম্পদের উৎস অনুসন্ধান ও অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধনকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের একটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, নির্ধারিত অর্থ না দিলে দলিল নিবন্ধনে হয়রানি কিংবা জটিলতার আশঙ্কা দেখানো হয়। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি, সংশ্লিষ্ট লেনদেনের তথ্য কিংবা তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শফিকুল ইসলাম এর আগে মেহেরপুর, ঝিনাইদহের মহেশপুর, নাটোর ও ফরিদপুরে রেজিস্ট্রেশন বিভাগের বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। ২০২১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি নাটোরের জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগ দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর ফরিদপুর জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের তথ্যও দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। এ সময় তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, অনুপস্থিতির বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—এসব বিষয়ে বিস্তারিত সরকারি নথি প্রয়োজন।
পরবর্তী সময়ে তিনি ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের দায়িত্বে আসেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নিবন্ধন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর হালনাগাদ করা তালিকায় তাঁকে ফরিদপুরের জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে দেখানো হয়েছিল বলে একই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এ কারণে তাঁর বর্তমান পদায়ন ও দায়িত্ব গ্রহণের সরকারি আদেশ যাচাই করা জরুরি।
শফিকুল ইসলাম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে ঢাকা, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, ঝিনাইদহ ও মেহেরপুরে একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট, মার্কেট, জমি এবং অন্যান্য সম্পদ থাকার অভিযোগ তুলেছেন প্রতিবেদনের সূত্রগুলো। এ ছাড়া পরিবারের সদস্যদের নামে গাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে সম্পত্তির মালিকানা, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস কিংবা সম্পদ অর্জনের সময়কাল সম্পর্কে যাচাই করা দলিল প্রতিবেদনে সংযুক্ত নেই। তাই সম্পদগুলো অবৈধভাবে অর্জিত কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও আর্থিক তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, অভিযোগের পরও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় তাঁরা ক্ষুব্ধ।
তবে দুদকে দাখিল করা অভিযোগের অনুলিপি, গ্রহণের তারিখ, অনুসন্ধান বা তদন্তের বর্তমান অবস্থা এবং এ বিষয়ে কমিশনের বক্তব্য প্রতিবেদনে নেই। ফলে অভিযোগটি বর্তমানে কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা নিশ্চিত হতে দুদকের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রয়োজন।
গত ৯ সেপ্টেম্বর পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জিএম রফিকুল ইসলামের ওপর হামলার অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে কি না, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত শুরু করেছে কি না এবং ঘটনার সঙ্গে জেলা রেজিস্ট্রারের কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে শফিকুল ইসলামের ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁর সম্পদের উৎস, দলিল নিবন্ধন ঘিরে ওঠা অভিযোগ এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জনআস্থা বাড়তে পারে।
তবে শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য, সরকারি নথি, সম্পদ বিবরণী এবং দুদকের তদন্তের তথ্য যাচাইয়ের ভিত্তিতেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত।