রাজধানীর মিরপুর-১ এলাকায় লেগুনা স্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদা আদায়কে কেন্দ্র করে কয়েকজন মালিককে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিদিন গাড়িপ্রতি ৩০০ টাকা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ৬০ থেকে ৭০ জনের একটি দল তাঁকে মারধর করেছে বলে অভিযোগ করেছেন বৃহত্তর মিরপুর লেগুনা মালিক-শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ইয়াকুব আলী। তাঁর দাবি, হামলার পর উল্টো তাঁকেই চাঁদাবাজ হিসেবে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন ইয়াকুব আলী। এ সময় তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং লেগুনা স্ট্যান্ডের মালিক-শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে ইয়াকুব আলী জানান, গত ৫ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর লেগুনার চালক গাড়িতে সমস্যার কথা জানালে তিনি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি প্রতিটি গাড়ি থেকে দৈনিক ৩০০ টাকা করে চাঁদা দাবি করেন বলে তাঁর অভিযোগ।
চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে এবং নজরুল ইসলাম ও বাবুল নামের আরও দুই লেগুনা মালিককে মারধর করা হয় বলে দাবি করেন তিনি। একপর্যায়ে তাঁদের আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে গুলি করার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন ইয়াকুব আলী। তাঁর দাবি, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে আগ্নেয়াস্ত্র বের করার দৃশ্য রয়েছে।
ইয়াকুব আলীর অভিযোগ, মারধরের শিকার হওয়ার পর তাঁকেই চাঁদাবাজ হিসেবে চিহ্নিত করে দারুস সালাম থানার পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। পরে পুলিশ তাঁকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং চিকিৎসা শেষে আদালতে পাঠানো হয়।
তিনি দাবি করেন, চাঁদাবাজির অভিযোগের পক্ষে তথ্যপ্রমাণ না পাওয়ায় পরে তিনি মুক্তি পান। এরপর হামলার ঘটনায় অভিযোগ জানাতে দারুস সালাম থানায় গেলেও পুলিশ তা গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনারের (ডিসি) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলেও জানান।
অভিযোগ গ্রহণ না করার বিষয়ে দারুস সালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দুলাল হোসেন জানান, মারধরের সময় ঘটনাস্থল থেকে ইয়াকুব আলীকে উদ্ধার করা হয়েছিল। পরে স্থানীয়ভাবে তদন্ত করে তাঁকে আদালতে পাঠানো হয়। জামিনে মুক্তির পর তিনি থানায় অভিযোগ দিতে এলে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি না থাকায় তা গ্রহণ করা হয়নি বলে জানান ওসি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বৃহত্তর মিরপুর লেগুনা মালিক-শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, মিরপুর-১ এলাকার পাঁচটি লেগুনা স্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে একটি গোষ্ঠী। সংগঠনটির দাবি, ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এস এ সিদ্দিক সাজুর অনুসারী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন স্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে মালিকদের চাপ দিচ্ছেন। একই সঙ্গে মাসে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
বিপ্লব, সোলেমান দেওয়ান, ফারুক হোসেন, মহব্বত আলী, মাভেল ভূঁইয়া, তৈয়ব আলী, আলমগীর হোসেন, কানা পলাশ, রাসেল, শামীম ও মজিবর রহমানসহ ৬০ থেকে ৭০ জনের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নিজেকে বৃহত্তর মিরপুর লেগুনা মালিক-শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক পরিচয় দেওয়া সাইদুর রহমানের অভিযোগ, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের সাবেক এবং বহিষ্কৃত নেতারাও রয়েছেন। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে একটি পক্ষ লেগুনা স্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং চাঁদা আদায়ের চেষ্টা করছে।
সাইদুর রহমান আরও অভিযোগ করেন, লেগুনা স্ট্যান্ডের বাইরেও মিরপুর-১ এলাকার কাঁচাবাজার, ফুটপাত, ভ্যানগাড়ি রাখার স্থান এবং বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবসাকে কেন্দ্র করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০ থেকে ৩০ জনের একটি দল সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পাঁচটি লেগুনা স্ট্যান্ডে অবস্থান করে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাঁকে আক্রমণের শিকার হতে হয় বলে দাবি করেন তিনি।
এ পরিস্থিতিতে লেগুনা মালিক-শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন সাইদুর রহমান।
অভিযোগের বিষয়ে সোলেমান দেওয়ান বলেন, মারধরের ঘটনায় তিনি জড়িত নন। রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ভাঙচুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং কাউন্সিলর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, এস এ সিদ্দিক সাজু বলেন, লেগুনাশ্রমিকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে মারামারির ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি শুনেছেন। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাঁরা এ ঘটনায় জড়িত নন বলেও তিনি জেনেছেন বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, রাজনীতি করার কারণে তাঁর অনুসারী থাকতে পারেন, তবে লেগুনা ব্যবসা বা ওই ঘটনার সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তিনি অবগত নন।
মিরপুর-১ এলাকায় লেগুনা স্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ, চাঁদা দাবি এবং মারধরের অভিযোগ ঘিরে মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একদিকে হামলা ও চাঁদা দাবির অভিযোগ, অন্যদিকে অভিযুক্তদের অস্বীকার—সব মিলিয়ে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নির্দোষ ব্যক্তির হয়রানি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।