নারায়ণগঞ্জের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) জেলা কার্যালয়ে যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও মালিকানা পরিবর্তনসহ বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ ও হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. মাহবুবুর রহমান।
ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের অভিযোগ, বিআরটিএ কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ঘিরে একটি দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে। সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ না দিলে বিভিন্ন অজুহাতে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি করা হয়। পরে দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার সুযোগ মেলে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও মালিকানা পরিবর্তনসহ বিভিন্ন সেবায় কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর বা অনুমোদনকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই অর্থ ১ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সেবার ধরন অনুযায়ী আরও বেশি হতে পারে।
নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ কার্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে। তাদের মধ্যে মোটরযান পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম, মোটরযান পরিদর্শক মো. সাইফুল কবির এবং সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. হেমায়েত হোসাইনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, নিজেরা সরাসরি সেবা নিতে গেলে কাগজপত্রের ত্রুটি বা বিভিন্ন জটিলতার কথা বলে ফাইল আটকে রাখা হয়। অনেক সময় বারবার অফিসে আসতে বলা হয়। একপর্যায়ে দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে একই সমস্যার দ্রুত সমাধান হয় বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
ফিটনেস সার্টিফিকেটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। নির্ধারিত কাগজপত্র ও সরকারি ফি জমা দেওয়ার পর গাড়ি পরিদর্শনের মাধ্যমে ফিটনেস দেওয়ার নিয়ম থাকলেও অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া কাজ পেতে বিলম্ব করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা।
ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত ফি, কাগজপত্র, পরীক্ষা ও বায়োমেট্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা। কিন্তু দ্রুত সেবা পেতে অনেক গ্রাহককে দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে সহকারী পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে। ঢাকায় ফ্ল্যাটসহ বিভিন্ন স্থানে সম্পদের মালিক হওয়ার দাবি করা হলেও এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন।
নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ কার্যালয়ে অনিয়ম ও দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়ে এর আগেও অভিযোগ ওঠার কথা জানা গেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযান পরিচালনার তথ্যও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই অভিযানে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখানে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, শুধু অভিযান পরিচালনা নয়, বিআরটিএ কার্যালয়ের সেবা প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা প্রয়োজন। প্রতিটি সেবার সরকারি ফি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও নির্ধারিত সময়সীমা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হলে দালালনির্ভরতা কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে মো. মাহবুবুর রহমানের বক্তব্যও জানতে চাওয়া হয়েছে। তিনি নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ কার্যালয়ে কোনো দালাল নেই এবং এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি জড়িত নন বলে দাবি করেছেন। ফলে অভিযোগকারী ও কর্মকর্তার বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র বের করে আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সরাসরি ও নির্ধারিত ফির মধ্যে সরকারি সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।