গ্যাস ও বিদ্যুতের চলমান সংকটে দেশের হালকা প্রকৌশল শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে বেড়ে গেছে উৎপাদন খরচ। অনেক ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তার উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। ফলে কর্মীদের বেতন-ভাতা দেওয়া, ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ফয়সল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ এক যুগের বেশি সময় ধরে পানির কল তৈরি করছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সোলায়মান পারসী জানান, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় তাঁদের উৎপাদন ৬০ শতাংশের বেশি কমেছে। বর্তমানে দিনে মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টা কারখানা চালানো সম্ভব হচ্ছে।
পানির কল তৈরিতে পিতল গলানোর জন্য সার্বক্ষণিক গ্যাসের প্রয়োজন হয়। সোলায়মান পারসী জানান, কারখানা চালু রাখতে প্রতিদিন প্রায় ১৮ হাজার টাকা খরচ হয়। স্বাভাবিক সময়ে দিনে ৭–৮ লাখ টাকার পণ্য উৎপাদন করা গেলেও গ্যাস সংকটে তা নেমে এসেছে ৩–৪ লাখ টাকায়।
উৎপাদন কমার পাশাপাশি কর্মীর সংখ্যাও কমেছে। এক বছর আগে প্রতিষ্ঠানটিতে ৩০ জন কর্মী থাকলেও বর্তমানে কাজ করছেন মাত্র ১২ জন।
যাত্রাবাড়ী এলাকায় পানির কল তৈরির আরও প্রায় সাড়ে তিন শ কারখানা রয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে এসব কারখানার উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার হালকা প্রকৌশল কারখানা রয়েছে। এ খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় লাখ।
রাজধানীর কেরানীগঞ্জ, বগুড়া, নারায়ণগঞ্জ, পাবনাসহ বিভিন্ন হালকা প্রকৌশল শিল্প এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক জায়গায় দিনে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোতে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় কাস্টিং ও হিট ট্রিটমেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
গাজীপুরের শালনায় কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি করে অ্যাগ্রো মেশিনারি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শেখ সাদী জানান, দিনে চার-পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যায় এবং প্রতিবার বিদ্যুৎ ফিরতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। এতে উৎপাদন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ক্রেতাদের অর্ডার অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কারখানা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কথাও ভাবছেন তিনি।
কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক ডাইস তৈরির প্রতিষ্ঠান ব্রাদার্স ইঞ্জিনিয়ারিংও একই সমস্যায় পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুল ইসলাম জানান, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে জেনারেটর চালাতে প্রতিদিন প্রায় ২০০ লিটার তেল প্রয়োজন হচ্ছে। গত এক মাসে জেনারেটর খরচ ৪০ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ বিল ৩০ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ।
উদ্যোক্তারা বলছেন, বাজারে চাহিদা কমার পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট যুক্ত হওয়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। উৎপাদন কমলেও অনেক ক্ষেত্রে খরচ বাড়ছে। এতে ছোট উদ্যোক্তাদের ওপর আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, উদ্যোক্তারা নিয়মিত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কথা জানাচ্ছেন। সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান অর্ডার পেয়েও সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বিষয়গুলো সরকারকে জানানো হচ্ছে বলে জানান তিনি।