রাজধানীতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে তাঁদের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবির অভিযোগে একটি চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।
রোববার মিন্টো রোডে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম।
ডিবির তথ্য অনুযায়ী, চক্রটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের অন্তত পাঁচজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে টার্গেট করেছিল। তাঁদের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক, কান, গলা ও হেড-নেক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক মো. আসাদুর রহমান এবং আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম আমিনুল হক ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, চিকিৎসকদের কাছে ফোন করে মার্কিন ডলারে চাঁদা দাবি করত চক্রটি। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁদের ভয় দেখানো ও হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
ডিবি জানিয়েছে, ফুড ডেলিভারি অ্যাপসহ বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে চিকিৎসকদের বাসা ও চেম্বারের ঠিকানা এবং পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হতো। এরপর আর্থিকভাবে স্বচ্ছল চিকিৎসকদের বাছাই করে তাঁদের মোবাইল ফোনে চাঁদার জন্য হুমকি দেওয়া হতো।
গত ২৭ জুলাই ধানমন্ডির ৪ নম্বর সড়কে গাড়ি থামিয়ে চিকিৎসক এ কে এম আমিনুল হককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে কয়েকজনের বিরুদ্ধে। এর কিছুদিন পর ১৭ আগস্ট রাতে শান্তিনগর এলাকায় হামলার শিকার হন চিকিৎসক আসাদুর রহমান।
ঘটনার সময় স্থানীয় লোকজন পুলিশকে খবর দিলে পল্টন থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে জীবন ওরফে আদিল নামে একজনকে আটক করে। অন্যরা পালিয়ে যায়। পরে আসাদুর রহমান বাদী হয়ে পল্টন মডেল থানায় মামলা করেন।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, হামলার কয়েক দিন আগে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন করে আসাদুর রহমানের কাছে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার দাবি করা হয়েছিল।
ঘটনার তদন্তে নেমে ডিবি চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত করার চেষ্টা শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় শনিবার রাতে শনির আখড়া থেকে সানি সাহা (৩৮) এবং খিলক্ষেত এলাকা থেকে ফাতিন ইসরাক লাবিব (২০) গ্রেপ্তার হন। এর আগে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে চারজন বর্তমানে পুলিশের হাতে আটক রয়েছেন।
ডিবির দাবি, চক্রটির অন্যতম মূলহোতা সানি সাহা। তিনি ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সিঙ্গাপুরে ছিলেন। সেখানে কাজ করার পর হুন্ডি ব্যবসায় যুক্ত হয়ে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। ওই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তিনি চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সিঙ্গাপুরে অবস্থানকালে আলমগীর হোসেনের সঙ্গে সানির পরিচয় হয়। পরবর্তী সময়ে সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তিদের বাসার ঠিকানা, গাড়ির নম্বর, পেশা, চলাফেরা ও আর্থিক অবস্থাসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয় সানিকে।
চিকিৎসক আমিনুল হক ও আসাদুর রহমানের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ আদায়ের পরিকল্পনাতেও সানিকে যুক্ত করা হয় বলে জানিয়েছে ডিবি। পরে হামলার জন্য লোক সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয় ফাতিনকে।
ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে ফাতিন জানিয়েছেন, আসাদুর রহমানের ওপর হামলার জন্য আবু বকর (১৮), রাতুল (১৯), ইবান (২২), জীবন (২১) ও সাব্বির (১৮) নামের কয়েকজনকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে যুক্ত করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ইবান ও জীবন ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।
ডিবিপ্রধান জানান, শুধু চিকিৎসকরাই নয়, সরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও চক্রটির সম্ভাব্য টার্গেট ছিলেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন দূতাবাসে ই-মেইলের মাধ্যমে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে আরেকটি চক্রের বিষয়েও তদন্ত চলছে বলে জানান তিনি।
পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের মাধ্যমে চক্রটির অন্যান্য সদস্য এবং তাদের কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য বের করার চেষ্টা চলছে।