তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সরকারের তুলনায় ছয় মাস অবশ্যই দীর্ঘ সময় নয়। তবে এই সময়ের মধ্যে সরকারের অগ্রাধিকার, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে তাদের প্রস্তুতি কতটা কার্যকর—তা নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়াটা স্বাভাবিক।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতেই স্বল্পমেয়াদি কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছিল। রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং জনগণের জীবনযাত্রার উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ছয় মাস পর নাগরিকদের একটি অংশ মনে করছে, ঘোষিত পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে এখনও যথেষ্ট ব্যবধান রয়েছে।
বর্তমানে দেশের অন্যতম বড় উদ্বেগ জ্বালানি সরবরাহ। শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন—বিভিন্ন খাতেই জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গ্যাস ও জ্বালানির অনিয়মিত সরবরাহের কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম কমার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরকারের ঘোষিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্যাস অনুসন্ধান এবং দেশীয় জ্বালানি সম্পদের ব্যবহার বাড়ানোর কথা রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি কবে থেকে দেখা যাবে?
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু কৃষকের ব্যাংকঋণ মওকুফের উদ্যোগ প্রশংসা পেয়েছিল। এতে বিপুলসংখ্যক কৃষক তাৎক্ষণিকভাবে আর্থিক চাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি পান।
তবে কৃষকদের সমস্যা শুধু ঋণেই সীমাবদ্ধ নয়। সার, বীজ, সেচ, কৃষি উপকরণের মূল্য এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম—সবকিছু মিলিয়ে কৃষকের দীর্ঘদিনের সংকট এখনো রয়ে গেছে বলে কৃষি সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।
কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন নিয়ে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের শুরুতেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু ছয় মাসের মাথায় চাঁদাবাজি, সংঘর্ষ, হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধের খবর জনমনে উদ্বেগ তৈরি করছে।
এর পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরক বা সন্দেহজনক বস্তু উদ্ধারের ঘটনাও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। নাগরিকদের প্রত্যাশা ছিল, নতুন সরকার দ্রুত একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হলে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আগের সরকারের সময় থেকেই দেশের ব্যাংকিং খাতে নানা ধরনের সমস্যা চলে আসছিল। খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং বিভিন্ন ব্যাংকে আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনে জটিলতা—এসব বিষয় নতুন সরকারের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।
ছয় মাসে ব্যাংকিং খাতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সাধারণ আমানতকারীদের একটি অংশ এখনো প্রত্যাশিত স্বস্তি পাননি। অর্থনীতির অন্যান্য খাতের সংকটের সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের সমস্যাও যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রনির্ভর। নাগরিক সেবা আরও কার্যকর করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেশি ক্ষমতা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বহুদিন ধরে আলোচনা চলছে।
কিন্তু সরকারের প্রথম ছয় মাসে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি—এমন অভিযোগ রয়েছে। বরং স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে।
সরকারপ্রধানের বিভিন্ন নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়িত না হওয়াও প্রশাসনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক থেকে আন্তজেলা বাসের কাউন্টার সরানোর মতো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতির অভিযোগ রয়েছে। ফলে যানজট ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কতটা এসেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ ধরনের উদাহরণ থেকে অনেকের ধারণা, সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।
সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় রাজনৈতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিদের নিয়োগ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। দীর্ঘদিন রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় থাকা নেতাদের মূল্যায়নের প্রয়োজন থাকলেও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
নৌপরিবহন, বস্ত্র, প্রযুক্তি, অর্থনীতি বা অন্যান্য কারিগরি খাতের প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি কার্যকর হবে—এমন মত রয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি পেশাগত যোগ্যতা যদি উপেক্ষিত হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
নতুন সরকারের প্রতি মানুষের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল সরকারি নিয়োগে যোগ্যতা ও মেধাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের।
সরকারের ছয় মাস শেষে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে এই নীতি কতটা অনুসরণ করা হয়েছে—তা নিয়ে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
গুম প্রতিরোধ এবং মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইন নিয়েও নাগরিক সমাজে আলোচনা চলছে। এসব আইনের কাঠামো ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি কতটা স্বাধীন এবং কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিভিন্ন অধিকারকর্মী ও সংগঠন।
বিশেষ করে তদন্তের স্বাধীনতা, কমিশনের সদস্য বাছাই এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন সরকার যদি সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করতে চায়, তাহলে আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা—সব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়া মানে সরকারের ব্যর্থতার চূড়ান্ত হিসাব নয়। একইভাবে এটিকে সাফল্যের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই।
তবে এই সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে সরকার কোন জায়গায় এগিয়েছে, কোথায় ব্যর্থ হয়েছে এবং কোন খাতে দ্রুত পরিবর্তন প্রয়োজন—তার একটি বাস্তব মূল্যায়ন এখন জরুরি।
জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, কৃষি, কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং মানবাধিকার—এসব বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারলেই সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
নির্বাচিত সরকারকে সফল করার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণেরও গঠনমূলক ভূমিকা রয়েছে। সরকারের ভালো কাজের প্রশংসার পাশাপাশি ভুল ও অনিয়মের সমালোচনাও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ছয় মাসের অভিজ্ঞতা তাই সরকারের জন্য যেমন আত্মমূল্যায়নের সময়, তেমনি নাগরিক সমাজের জন্যও প্রশ্ন তোলার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।