জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম শুধু কবি বা গীতিকার হিসেবেই নয়, চলচ্চিত্রের নানা ক্ষেত্রেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক, কাহিনিকার, পরিচালক ও অভিনেতা হিসেবে কাজ করেছেন।
নজরুল ছিলেন স্বভাবতই অস্থির ও চঞ্চল। তবে সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন গভীর মনোযোগী। নির্দিষ্ট কোনো একটি বিষয়ে নিজেকে আটকে রাখেননি। চলচ্চিত্রে কাজ করার সময় সহশিল্পীদের অভিনয় শেখানো, গান তুলে দেওয়া এবং উচ্চারণ ঠিক করে দেওয়ার মতো কাজও করতেন।
ত্রিশের দশকে পার্সি মালিকানাধীন চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান ম্যাডান থিয়েটার্সে ‘সুর ভাঙারি’ পদে কাজ করেন নজরুল। পরে চলচ্চিত্র প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত হন।
১৯৩৩ সালে পায়োনিয়ার ফিল্মস কোম্পানি থেকে নির্মিত ‘ধ্রুব’ চলচ্চিত্রে গান লেখা ও সংগীত পরিচালনার পাশাপাশি দেবর্ষি নারদের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি ছবিটি মুক্তি পায়। নারদের প্রচলিত বৃদ্ধ অবয়বের বদলে নজরুল তাঁকে তরুণ ও সুদর্শন রূপে উপস্থাপন করেছিলেন।
নজরুল নিজেও ‘ধূপছায়া’ চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন এবং এতে বিষ্ণুর চরিত্রে অভিনয় করেন। এ ছাড়া ‘জামাইষষ্ঠী’, ‘জলসা’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রের সঙ্গে তিনি সুরকার ও শিল্পী হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
১৯৩৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সাপুড়ে’ চলচ্চিত্রের কাহিনি ও সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নজরুল। বেদে সম্প্রদায়ের জীবন সম্পর্কে জানতে তিনি তাঁদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন।
১৯৩৫ সালের ‘পাতালপুরী’ চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেন এবং গান লেখেন। কয়লাখনি শ্রমিকদের জীবনসংগ্রামকে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিটির জন্য ঝুমুর সুরে গান রচনা করেছিলেন তিনি।
এ ছাড়া **‘গৃহদাহ’, ‘গ্রহের ফের’, ‘বিদ্যাপতি’, ‘গোরা’**সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রের সংগীত ও সুরের সঙ্গে নজরুলের গুরুত্বপূর্ণ সম্পৃক্ততা ছিল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘গোরা’ চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালকও ছিলেন নজরুল। ছবিতে রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহারের বিষয়ে আপত্তি উঠলে নজরুল সরাসরি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে নিজের গান ব্যবহারের স্বাধীনতা দেন।
১৯৪২ সালের ‘চৌরঙ্গী’ চলচ্চিত্রে গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন নজরুল। একই বছর ‘দিলরুবা’ চলচ্চিত্রের গান ও সুরের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
১৯৪১–৪২ সালে ‘মদিনা’ নামে একটি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য, গান, সুর ও সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব নেন নজরুল। ছবিটির জন্য তিনি ১৫টি গান লিখেছিলেন। কিন্তু ১৯৪২ সালে অসুস্থ হয়ে পড়ায় চলচ্চিত্রটি আর মুক্তি পায়নি।
১৯৪১ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় নজরুল ‘বেঙ্গল টাইগার্স পিকচার্স’ নামে একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এ উদ্যোগে তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি যুক্ত ছিলেন।
নজরুলের মৃত্যুর পরও তাঁর গান বিভিন্ন চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। **‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘জীবন থেকে নেয়া’ ও ‘লায়লা-মজনু’**সহ বিভিন্ন ছবিতে তাঁর গান দর্শকদের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ গানটির ব্যবহার বিশেষভাবে আলোচিত। ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ছবিতে ‘পথহারা পাখি কেঁদে ফেরে একা’ এবং ‘লায়লা-মজনু’তে নজরুলের আরেকটি গানও ব্যবহৃত হয়।
নজরুলের গল্প ও উপন্যাস অবলম্বনেও পরবর্তীকালে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। তাঁর ‘মেহের নেগার’, ‘রাক্ষসী’, ‘জ্বিনের বাদশাহ’, ‘মৃত্যুক্ষুধা’, ‘ব্যথার দান’ ও ‘পদ্মগোখরা’ অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।
এ ছাড়া শিশুদের জন্য তাঁর ‘লিচু-চোর’ ও ‘খুকী ও কাঠবেরালি’ কবিতা অবলম্বনেও চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে।
সাহিত্য, সংগীত ও চলচ্চিত্র—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নজরুলের বহুমাত্রিক প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। তাই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে শুধু কবি হিসেবে নয়, বাংলা চলচ্চিত্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ বহুমুখী শিল্পী হিসেবেও স্মরণ করা যায়।