জ্বালানি তেলের দাম একবারে ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে এক ধাক্কায় লিটারপ্রতি জ্বালানি তেলের দাম ৩৪ থেকে ৪৬ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। ওই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে পরিবহন, কৃষি, শিল্প উৎপাদন ও বিভিন্ন সেবায়। এর সঙ্গে বেড়ে যায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও।
এরপর দেশে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশের মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৮ শতাংশ। চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের নিচে না নামায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। বাজার খরচ কমানো, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় সামলানোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক পরিবারকে ব্যয় সংকোচনের পথ বেছে নিতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়ে। বাড়তে থাকে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম। হরমুজ প্রণালিতে পরিবহন পরিস্থিতি বিঘ্নিত হওয়ায় পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতার প্রভাব দেশের বাজারেও পড়ে। বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি সংগ্রহে দীর্ঘ অপেক্ষা, বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা এবং শিল্প ও বাসাবাড়িতে জ্বালানি সংকটের অভিযোগ সামনে আসে। এর প্রভাব পড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও।
যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম দিকে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখলেও এপ্রিল মাসে সরকার এক দফা দাম বাড়ায়। একই সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়। এরপর মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম আরও ২০ টাকা করে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দুই দফা বৃদ্ধির ফলে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দাম মোট ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পেছনে সরকার মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার বিষয়টি তুলে ধরেছে। সরকারের হিসাবে, এতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ভর্তুকি ও লোকসানের চাপ বেড়েছে।
এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় সীমান্ত দিয়ে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এমন যুক্তিও দেওয়া হয়েছে। দাম সমন্বয়ের মাধ্যমে সেই ঝুঁকি কমানোর কথা বলা হয়েছে।
তবে একবারে ২০ টাকা দাম বাড়ানোর পরিবর্তে অন্য কোনো পদ্ধতি নেওয়া যেত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের আরেকটি দিক হলো বিপিসির অতীত আর্থিক হিসাব। প্রকাশিত নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্যের বরাত দিয়ে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রায় ১০ বছরে বিপিসি প্রায় ৫৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে।
এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘ সময় ধরে লাভে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক বাজারের কয়েক মাসের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির ক্ষতি সামাল দিতে ভোক্তাদের ওপর একবারে বড় মূল্যবৃদ্ধির চাপ দেওয়া কতটা প্রয়োজনীয় ছিল।
আরেকটি আলোচনার বিষয় হলো জ্বালানি তেলের ওপর বিদ্যমান কর ও শুল্ক। প্রতি লিটার তেলের দামের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কর ও শুল্ক হিসেবে নেওয়া হয়। এগুলো সাময়িকভাবে কমানো গেলে তেলের দাম একবারে ২০ টাকা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা কমতে পারত কি না, সেটিও আলোচনায় এসেছে।
এ ছাড়া জ্বালানি খাতে অপচয়, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা ও সিস্টেম লস কমানোর মাধ্যমে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে প্রতিবেশী দেশগুলোর দামের বিষয়টি উল্লেখ করা হলেও শুধু দাম দিয়ে পরিস্থিতি বিচার করা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দাম বাড়ানোর পর বাংলাদেশের ডিজেলের দাম ভারতের দিল্লি, কলকাতা ও মুম্বাইয়ের তুলনায় বেশি হয়েছে। একইভাবে ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের ডিজেলের দামও আলাদা পর্যায়ে রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের আলোচনায় শুধু জ্বালানির দাম নয়, সংশ্লিষ্ট দেশের মূল্যস্ফীতি, মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। কারণ একই দামের জ্বালানি বিভিন্ন দেশের মানুষের ওপর একই ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে না।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরপরই এর প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। সরকার দূরপাল্লা ও নগর পরিবহনের বাসভাড়ায় কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে বিভিন্ন রুটে এর আগেই বাসভাড়া বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। পণ্য পরিবহনের খরচও বাড়ছে। একই সঙ্গে মোটরসাইকেল রাইড শেয়ারিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং এই সেবার ওপর নির্ভরশীল যাত্রীদের খরচও বাড়ছে।
ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু গাড়ির মালিক বা চালকদের ওপর নয়, পণ্য পরিবহন ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যয়ের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন জারির কয়েক দিনের মধ্যেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের বাড়তি ব্যয় কতটা হবে এবং সেই অর্থের উৎস কী হবে, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
অর্থনীতিতে যখন মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ও বিনিয়োগের ধীরগতি রয়েছে, তখন একদিকে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি এবং অন্যদিকে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সামগ্রিক অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বেসরকারি খাতেও একই হারে বেতন ও মজুরি বাড়ানোর সক্ষমতা কতটা রয়েছে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সরকারের হিসাবে বছর শেষে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসান বা ব্যয়ের চাপ কমতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এর প্রভাব যদি পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও নিত্যপণ্যের দামে পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের ব্যয়ও বাড়বে।
এ কারণে শুধু বিপিসির আর্থিক চাপ কমানো নয়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অর্থনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
জ্বালানি সংকটের বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি কর-শুল্ক কাঠামো, বিপিসির আর্থিক ব্যবস্থাপনা, অপচয় কমানো এবং জ্বালানি খাতে দক্ষতা বাড়ানোর মতো বিকল্প পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হতে পারে, সেটিও এখন নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।