ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আগামী ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দেশটির ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন দলটির নেতা অভিজিৎ দিপকে।
শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে অভিজিৎ দিপকে জানান, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সমর্থকেরা দিল্লিতে গিয়ে বিক্ষোভ করবেন। কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে ‘চলো দিল্লি’।
দিপকে বলেন, এই আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালিত হবে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চান, এমন সব নাগরিককে এতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এর আগে মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে আয়োজিত এক বিক্ষোভে বক্তব্য দেওয়ার সময়ও একই ধরনের কর্মসূচির ঘোষণা দেন সিজেপির এই নেতা। তিনি বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ না করলে দেশজুড়ে তরুণেরা দিল্লিতে সমবেত হবেন। এ কর্মসূচিকে ‘যন্তর মন্তর ২.০’ নামে অভিহিত করেন তিনি।
মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্ক এলাকায় প্রচণ্ড গরম ও পুলিশের বাধার মধ্যেও বিক্ষোভে অংশ নেন বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী। কর্মসূচির জন্য পুলিশের অনুমতি না থাকলেও দাদর স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হন। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশও এ কর্মসূচির বিরোধিতা করেছিলেন।
বিক্ষোভকারীদের হাতে ভারতের জাতীয় পতাকা ও বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। সেগুলোতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি জানানো হয়।
স্টুডেন্ট ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (এসএফআই) এবং অন্যান্য সংগঠনের কর্মীরাও কর্মসূচিতে অংশ নেন। পুনের অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস ফেডারেশন (এআইএসএফ)-সংশ্লিষ্ট সংগঠনের কর্মীরা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে বিক্ষোভে যোগ দেন।
সিজেপি নেতা অজিঙ্ক্য শিন্ডে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম শুরুর দাবি জানিয়েছেন। এ ছাড়া ২০২৫ সালের ভোটার তালিকা স্থগিত করা এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের পদ্ধতি নির্ধারণকারী ২০২৩ সালের আইন বাতিলের দাবিও তুলেছেন তিনি।
অভিজিৎ দিপকের অভিযোগ, গত দুই বছরে ভারতের ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালে দেশটিতে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ছিল ৯৭ কোটি।
দিপকে আরও অভিযোগ করেন, লোকসভা নির্বাচনে এনডিএ ও ইন্ডিয়া জোটের ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র ২ শতাংশ। তাঁর দাবি, নির্বাচনের মাত্র ১৫ দিন আগে জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল ব্যবধান বাড়ানোর উদ্দেশ্যে।
মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনেও ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন তিনি। দিপকের দাবি, ওই নির্বাচনে ভোটার তালিকায় ৪০ লাখ ভোটার যুক্ত করা হয়েছিল।
দিল্লিতে আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নির্বাচনী আসনে ৪০ হাজার ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কেজরিওয়াল ওই নির্বাচনে ৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন।
তামিলনাড়ুর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনের নির্বাচনী আসন থেকেও প্রায় এক লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন দিপকে। তাঁর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
তবে বিজেপির সমর্থকেরা বলছেন, তেলেঙ্গানা, কর্ণাটক ও ঝাড়খন্ডে বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে জয় পেয়েছে। তাঁদের মতে, এসব ফলাফল নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিপরীত উদাহরণ।
এর জবাবে দিপকে বলেন, কোনো ম্যাচে অনিয়ম থাকলেই প্রতিটি বল নো-বল হয় না কিংবা প্রতিটি ক্যাচ ছেড়ে দেওয়া হয় না।
একসঙ্গে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তাবের সমালোচনা করে দিপকে দাবি করেন, বিজেপির লক্ষ্য ‘এক দেশ, এক নির্বাচন, এক দল’ প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর অভিযোগ, আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। এ প্রসঙ্গে মহারাষ্ট্রের শিবসেনা ও ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির (এনসিপি) বিভক্তির বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি। একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শিবসেনাকে ‘শেল কোম্পানি’ বলেও মন্তব্য করেন এই নেতা।
সিজেপির নেতারা জানান, মহারাষ্ট্র থেকেই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে তাঁদের আন্দোলন শুরু হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা নিয়ে কথিত অনিয়মের সূত্রপাত এই রাজ্যে।
এ সময় নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দুই মাস আগে যন্তর মন্তরে হওয়া বিক্ষোভের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন দিপকে। তাঁর বক্তব্য, অল্প সময়ের ব্যবধানে আবারও বিক্ষোভের প্রয়োজন হওয়া সরকারের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
শিবাজি পার্কের কর্মসূচিতে অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ ও শাবানা আজমি, চলচ্চিত্র নির্মাতা বিশাল ভরদ্বাজ ও হানসাল মেহতা, সংগীত পরিচালক বিশাল দাদলানি এবং মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী উপস্থিত ছিলেন।
মহাত্মা গান্ধীর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে মঞ্চে অহিংসা ও সরলতা নিয়ে বিভিন্ন উদ্ধৃতি প্রদর্শন করা হয়। পাশাপাশি বাবাসাহেব আম্বেদকরের প্রতিও শ্রদ্ধা জানানো হয়। অনুষ্ঠানে ‘রং দে বাসন্তী’ চলচ্চিত্রের শিরোনাম গান ও এ আর রহমানের ‘বন্দে মাতরম’ গান বাজানো হয়।
শিবসেনা (ইউবিটি) আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। দলটির স্থানীয় বিধায়ক মহেশ সাওয়ান্ত জানান, অসুস্থতার কারণে দলীয় নেতা আদিত্য ঠাকরে বিক্ষোভে উপস্থিত হতে পারেননি।
এদিকে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারীদের আটক করার ঘটনায় দিল্লি পুলিশের সমালোচনা করেন সিজেপি নেতা সৌরভ দাস। তিনি পুলিশের আচরণ নিয়ে আপত্তি জানান এবং এ ধরনের পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
কমিউনিস্ট কর্মী শৈলেশ কাম্বলে বলেন, বামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি সংগঠন শিবাজি পার্কের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে।
আইনের শিক্ষার্থী আয়ান প্যাটেল জানান, তাঁর কলেজের অনেক শিক্ষার্থীও বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ভোট দেওয়া প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার। সেই অধিকার সুরক্ষিত না থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কিশোরী আনুজা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করে বক্তব্য দেয়। এ ছাড়া কর্মসূচিতে কয়েকজন অংশগ্রহণকারী ব্যতিক্রমী উপকরণ ব্যবহার করে প্রতিবাদ জানান। মণীশ মণ্ডল নামের এক শিক্ষার্থী ‘মেলোডি’ চকলেটের মোড়ক দিয়ে তৈরি গয়না পরে আসেন। তাঁর হাতে ছিল দেবনাগরী লিপিতে ‘ফ্রড ডিটারজেন্ট পাউডার’ লেখা একটি ব্যানার।