লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় আখতারুজ্জামান হত্যা মামলার চূড়ান্ত অভিযোগপত্র (চার্জশিট) নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মামলার এজাহারে নাম থাকা দুই আসামি রুবি বেগম ও ইনতি বেগমকে অর্থের বিনিময়ে চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুস ছালামের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে সাক্ষীদের সঙ্গে কথা না বলেই তাঁদের নামে চার্জশিটে বিবৃতি যুক্ত করার অভিযোগও করেছেন মামলার বাদী ও কয়েকজন সাক্ষী।
মামলার বাদী লুনা আক্তার মিমের দাবি, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার পরও রুবি ও ইনতিকে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। তাঁর অভিযোগ, এজাহারভুক্ত সাক্ষীদের সঙ্গে কথা না বলেই তাঁদের নামে মনগড়া বক্তব্য লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
চার্জশিটে ১ নম্বর সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ৬৫ বছর বয়সী ছবিতন নেছাকে। তিনি জানান, হত্যা মামলার বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুস ছালাম তাঁর সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। এমনকি তিনি ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে চেনেন না বলেও দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, তিনি কোনো সাক্ষ্য না দিলেও চার্জশিটে তাঁর নামে মিথ্যা বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।
রুবি ও ইনতি হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন কি না, জানতে চাইলে ছবিতন নেছা বলেন, ঘটনার সময় তিনি ঘরে ছিলেন এবং ওই দুই নারী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর দাবি, তাঁরা দুজনই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন।
অন্যদিকে, চার্জশিটের ২ নম্বর সাক্ষী ৬২ বছর বয়সী হোসেন আলী জানান, তদন্ত কর্মকর্তা তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন, ঘটনার সময় রুবি ও ইনতি ঘরে উপস্থিত ছিলেন। তবে ইনতি কোলে শিশু নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর দাবি, রুবিসহ অন্য আসামিদের হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকতে তিনি দেখেছেন।
চার্জশিটের ৩ নম্বর সাক্ষী ৪৫ বছর বয়সী লিপি বেগমের দাবি, পুলিশ তাঁর সঙ্গে কোনো কথা বলেনি এবং তিনি তদন্ত কর্মকর্তাকে কখনো দেখেননি। কোনো সাক্ষ্য না দিলেও চার্জশিটে তাঁর নামে বিবৃতি যুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। লিপি বেগমের ভাষ্য, ঘটনার সময় অন্য আসামিদের সঙ্গে রুবি ও ইনতিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
চার্জশিটে আরও কয়েকটি অসংগতির অভিযোগ তুলেছেন বাদী। অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার দিন তাঁর শ্লীলতাহানির আলামত হিসেবে পরনের কাপড় জব্দ দেখানো হলেও অভিযোগপত্রে দণ্ডবিধির ৩৫৪ ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এ ছাড়া চার্জশিটে ৩ নম্বর সাক্ষী ও মামলার বাদীর মুঠোফোন নম্বর একই রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
আখতারুজ্জামানের স্ত্রী ও মামলার বাদী লুনা আক্তার মিম বলেন, তদন্তের শুরু থেকেই কর্মকর্তা আব্দুস ছালাম তাঁর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন। সাক্ষীদের সঙ্গে কথা না বলে তাঁদের নামে বক্তব্য তৈরি করা হয়েছে এবং আসামিপক্ষের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুই ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন। পাশাপাশি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পুনঃতদন্তের মাধ্যমে রুবি ও ইনতিকে আবারও অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুস ছালামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি থানায় গিয়ে দেখা করতে বলেন। তবে পরে থানায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হয়নি।
হাতীবান্ধা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মতিউর রহমান বলেন, আখতারুজ্জামান হত্যা মামলা দায়ের এবং অভিযোগপত্র দাখিলের সময় তিনি ওই থানায় কর্মরত ছিলেন না। একজন পুলিশ কর্মকর্তা পেশাগত দায়িত্বের বাইরে বা আইনবহির্ভূত কোনো কাজ করতে পারেন না। তবে এ বিষয়ে লিখিত বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা খতিয়ে দেখা হবে।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ৩১ আগস্ট মামলাটির অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এর আগে ২ এপ্রিল লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার পূর্ব ফকিরপাড়া গ্রামে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে নিজ বাড়িতে হামলার শিকার হন আখতারুজ্জামান। পরদিন ৩ এপ্রিল রংপুর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী লুনা আক্তার মিম স্থানীয় থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।