চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে, আহত অবস্থায় হাসপাতালে বাংলাদেশিরা
নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করার আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ করেছেন একদল বাংলাদেশি। তাঁদের মধ্যে কেউ নিহত হয়েছেন, কেউ নিখোঁজ, আবার কেউ গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আহতদের একজন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার মো. আলী হাসান সোহেল। বর্তমানে তিনি রাশিয়ার পেনজা শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
প্রায় এক মাস ১০ দিন ধরে হাসপাতালে থাকা আলী হাসান দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন। সম্প্রতি ভিডিও কলে তিনি নিজের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার কথা জানান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, এমন জীবন কেউ চান না। বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, সুস্থ হলে দেশে ফেরানোর চেষ্টা করা হবে বলে তাঁকে জানানো হয়েছে। তবে তাঁর আশঙ্কা, সুস্থ হওয়ার পর আবারও তাঁকে যুদ্ধে পাঠানো হতে পারে।
নিজের শারীরিক অবস্থা তুলে ধরে আলী হাসান বলেন, এক বছরের মধ্যে তিনি আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত প্রার্থনা করছেন তিনি। তাঁকে উদ্ধার করে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়েছেন এই প্রবাসী।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ মে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করার উদ্দেশ্যে ৩০ জন বাংলাদেশি একসঙ্গে রাশিয়ায় যান। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আলী হাসানও। ওই দলের ১৫ জনের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের পরিবার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে জানা গেছে, রাশিয়ায় যাওয়ার পর তাঁরা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাকরি পাননি। বরং প্রতারণার মাধ্যমে তাঁদের রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, ওই ৩০ জনের মধ্যে অন্তত ২০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন। দুজন হাসপাতাল থেকে পালিয়ে দেশে ফিরেছেন। অন্য দুজন পৃথক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন।
আলী হাসানের বর্ণনা অনুযায়ী, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর ওই বাংলাদেশিদের একটি সেনা ক্যাম্পে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়। আলী হাসান ছিলেন ১৬ জনের একটি দলে।
তাঁর দাবি, মাত্র পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে ষষ্ঠ দিনে তাঁদের দলের পাঁচজনকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। দীর্ঘ পথ হেঁটে এবং সঙ্গে থাকা শুকনো খাবার খেয়ে প্রায় তিন দিন পর তাঁরা মাটির নিচে অবস্থিত একটি সেনা ক্যাম্পে পৌঁছান। পরে তাঁদের দলের অন্য সদস্যরাও সেখানে যোগ দেন।
আলী হাসান জানান, একপর্যায়ে তাঁদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে সেনাবাহিনীর পোশাক পরানো হয়। এরপর একজন একজন করে সামনের দিকে পাঠানো হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৬ জনের দলের ১৪ জন এখন নিখোঁজ এবং বাকি দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
যুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানালে বন্দী করে রাখা, মারধর এবং শাস্তি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন আলী হাসান। তাঁর দাবি, একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে হয়।
নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, হাতে অস্ত্র দিয়ে তাঁদের বলা হতো, যুদ্ধ করতে হবে না; শুধু সামনে-পেছনে কিংবা ডানে-বাঁয়ে যেতে হবে। কিন্তু তাঁর মতে, এভাবে পাঠানো তাঁদের জন্য মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়। যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার পর ইউক্রেনের ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কেউ নিহত হন, আবার কেউ আহত হয়ে ফিরলে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
আলী হাসানের সঙ্গে প্রথম দফায় যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো পাঁচজনের দলে ছিলেন গোপালগঞ্জের সদর উপজেলার বাসিন্দা মো. পলাশ শেখ। ড্রোন হামলায় তাঁর একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বর্তমানে তিনি মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
পলাশের ফুফাতো ভাই আবু সালেহ ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, পলাশের শারীরিক অবস্থার কারণে তাঁকে আর যুদ্ধে পাঠানো হবে কি না, তা নিয়ে পরিবার উদ্বিগ্ন। সুস্থ হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। তবে পলাশ যেকোনোভাবে দেশে ফিরতে চান।
পলাশকে দেশে ফিরিয়ে আনা ও পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার আবেদন জানিয়ে তাঁর বোন চুমকি খানম গত ২৬ জুলাই প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। সেখানে বলা হয়, উন্নত জীবনের আশায় ধারদেনা ও উচ্চ সুদের ঋণ নিয়ে পলাশ রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন এবং তাঁকে কৌশলে রুশ সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে পরিবারের অভিযোগ।
আলী হাসানের স্ত্রী আকলিমা খাতুনও গত ২৬ জুলাই প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। স্বামীকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান তিনি। আবেদনে বলা হয়, জীবিকার সন্ধানে রাশিয়ায় গিয়ে আলী হাসান প্রতারণার শিকার হন। অন্যদিকে, তাঁর পরিবারকে ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য পাওনাদারদের চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
পলাশের পরিবারও একই ধরনের আর্থিক সংকটের কথা জানিয়েছে। তাঁদের দাবি, ঋণ নিয়ে বিদেশে পাঠানো স্বজনকে উদ্ধার করার পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক দুরবস্থা কাটাতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।
আলী হাসান ও পলাশের বিষয়ে মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুদ্ধে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন এবং দেশে ফিরতে চান—এমন কেউ দেশে ফেরানোর বিষয়ে দূতাবাসের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করেননি বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, আলী হাসান ও পলাশের পরিবারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করার কথা জানানো হয়েছে। ফলে তাঁদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগ এবং দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের বর্তমান অবস্থা স্পষ্ট করা জরুরি।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এরপর বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় কর্মী যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশিদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন ঘটনায় বাংলাদেশিদের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত করা কঠিন।
রাশিয়ায় কাজের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগ সম্পর্কে ঢাকায় রুশ দূতাবাসের বক্তব্য চাওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যুক্ত করা প্রয়োজন।
অভিবাসন খাতের গবেষণা সংস্থা রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী মনে করেন, রাশিয়ার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বাংলাদেশিদের দায়িত্ব নেওয়া উচিত বাংলাদেশ দূতাবাসের। তাঁর মতে, আহতদের চিকিৎসার ব্যয়, পাওনা ও ক্ষতিপূরণ আদায়ে উদ্যোগ নিতে হবে এবং সুস্থ হওয়ার পর দ্রুত দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
চাকরির আশায় বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশিদের যুদ্ধক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ নতুন করে অভিবাসন ব্যবস্থাপনা, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং বিদেশে কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান, নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি উঠেছে।