সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির প্রায় এক লাখ অস্থায়ী পদে নিয়োগ কার্যক্রম আটকে গেছে। আউটসোর্সিং নীতিমালা সংশোধনের পর নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন দপ্তর কর্মী নিয়োগ দিতে পারছে না, যার প্রভাব পড়ছে সরকারি সেবায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের এসব পদে আগে বেসরকারি সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মী নেওয়া হতো। তবে সংশোধিত নীতিমালায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে সেবা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালায় এ ধরনের সরাসরি নিয়োগের স্পষ্ট বিধান না থাকায় নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করতে জটিলতা দেখা দিয়েছে।
গত ২১ সেপ্টেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয় ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০২৫’ সংশোধন করে। নতুন ব্যবস্থায় মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তর নিজেরা সরাসরি কর্মী নিয়োগ করতে পারবে। পাশাপাশি অর্থ বিভাগের অনুমোদিত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান আইআইএফসির মাধ্যমেও সেবা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে সরকারি ক্রয় আইন, ২০০৬ এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা, ২০২৫-এ সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরনের সেবা নেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত না থাকায় বাস্তবায়নে বাধা তৈরি হয়েছে। চলমান দরপত্রের ক্ষেত্রে কী করা হবে, সে বিষয়েও সংশোধিত নীতিমালায় স্পষ্ট নির্দেশনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের যুগ্ম সচিব আসিব আহসান প্রথম আলোকে বলেন, চলমান দরপত্রের বিষয়ে করণীয় জানতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বিভাগের কয়েক হাজার সেবাকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা থাকলেও নীতিমালা স্পষ্ট না হওয়ায় কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না।
নতুন নীতিমালার কারণে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অস্থায়ী পদে নিয়োগ প্রস্তাব ঝুলে রয়েছে। এসব পদের মধ্যে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ল্যাব সহকারী, ট্রলিম্যান এবং সরকারি বাসভবন ও কার্যালয়ের বিভিন্ন সেবামূলক কাজের কর্মী রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০ হাজার সেবাকর্মী এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীন সরকারি বাসভবন ও দপ্তরের জন্য প্রায় পাঁচ হাজার কর্মী নিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। রেলপথ, সমাজকল্যাণ ও কৃষি মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য দপ্তরেও একই ধরনের জটিলতা দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় এক লাখ অস্থায়ী পদে নিয়োগ কার্যক্রম অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
নীতিমালা বাস্তবায়নের আইনি জটিলতা নিরসনে অর্থ বিভাগ গত ২১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষকে (বিপিপিএ) চিঠি দেয়। এতে সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার উদ্যোগ নিতে বলা হয়।
অর্থ বিভাগের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি কাজে গতি আনা, দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো এবং ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্যেই নীতিমালাটি সংশোধন করা হয়েছে। তবে সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে সেবা নেওয়ার ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি করা প্রয়োজন।
অর্থ বিভাগের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিপিপিএ বিষয়টি পর্যালোচনা করে ১৪ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়কে নিজেদের পর্যবেক্ষণ জানায়।
বিপিপিএর মতে, আউটসোর্সিং ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সরকারি দপ্তর ও সেবাকর্মীদের মধ্যে সরাসরি চুক্তিগত সম্পর্ক এড়িয়ে চলা। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে এসব কর্মীকে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি থেকে সৃষ্ট আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর পরিকল্পনাও ছিল।
সংস্থাটি আরও বলেছে, সরাসরি ব্যক্তির সঙ্গে চুক্তির সুযোগ তৈরি হলে বর্তমান আউটসোর্সিং কাঠামো বদলে যেতে পারে। এতে চুক্তি বাস্তবায়ন, কর্মীদের দক্ষতা, জবাবদিহি এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক দায় নিয়ে নতুন সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিপিপিএর পর্যবেক্ষণে বেসরকারি সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিলে বিদ্যমান সেবা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং সরকারি ক্রয়ে সমান অংশগ্রহণের প্রশ্ন উঠতে পারে বলে সংস্থাটি মনে করে।
এ ছাড়া সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রেও জনবল, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সম্ভাব্য স্বার্থের দ্বন্দ্ব বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নীতিমালার বিভিন্ন দিক সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করতে অর্থ বিভাগ, বিপিপিএ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।
আউটসোর্সিং ব্যবস্থায় নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, চাকরি পেতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের অর্থ দিতে হয়। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরও মাসিক বেতন থেকে একটি অংশ কেটে রাখা হয় বলে তাঁদের দাবি। এ কারণে তাঁরা সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনায় নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছেন।
অন্যদিকে সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা বলছেন, তাঁদের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের প্রশিক্ষণ, তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়। সরাসরি নিয়োগ চালু হলে এসব কাজ পরিচালনায় সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলে তাঁদের মত।
বাংলাদেশ আউটসোর্সিং ম্যানপাওয়ার প্রোভাইডার সোসাইটির সভাপতি আবু তালেব প্রথম আলোকে বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাঁচ লাখের বেশি কর্মী সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেয়েছেন। এসব কর্মীর প্রশিক্ষণ ও তদারকির দায়িত্ব সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পালন করে। তাঁর আশঙ্কা, সরাসরি নিয়োগ চালু হলে সরকারি কাজে বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম বাড়তে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালে প্রথম আউটসোর্সিং নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও পেনশনের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ২০০৯ সাল থেকে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কিছু পদে সরাসরি সরকারি নিয়োগের পরিবর্তে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মী নেওয়া শুরু হয়।
নীতিমালায় বলা হয়েছিল, সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করা যাবে না; স্বীকৃত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ ও ২০২৫ সালে নীতিমালাটি সংশোধন করা হয়।
বর্তমানে নতুন নীতিমালা কার্যকর করতে আইনি কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় এবং নিয়োগপদ্ধতি নিয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আলোচনার মাধ্যমে জটিলতা নিরসন না হওয়া পর্যন্ত সরকারি দপ্তরগুলোর বিপুলসংখ্যক অস্থায়ী পদে নিয়োগপ্রক্রিয়া অনিশ্চয়তায় থাকতে পারে।