মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের আবেদন প্রায় ১০ মাস ধরে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামি হিসেবে বিচারাধীন রয়েছেন আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান। বর্তমানে তাঁরা কারাগারে আছেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরে কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের আবেদন বার কাউন্সিলে পাঠানো হয়। তখন মামলাটি মূল বিচার শুরুর আগের প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ে ছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয় এবং পরে সাক্ষ্য গ্রহণও শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত ১২ জন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
পলাশ চন্দ্র রায় বলেন, আবেদনটি দীর্ঘদিন নিষ্পত্তি না হওয়ায় আসামিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটি শেষ হওয়ার পর বার কাউন্সিলের সদস্যরা একত্র হলে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের আবেদনগুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ চলছে এবং নিয়মিত কার্যক্রম ২৫ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়ার কথা।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। আইনের ১১ ধারার ৮ উপধারা অনুযায়ী, বার কাউন্সিলের পূর্বানুমতি সাপেক্ষে ট্রাইব্যুনাল বিদেশি আইনজীবীকে মামলা পরিচালনার অনুমতি দিতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া বার কাউন্সিল এই অনুমতি আটকে রাখতে পারবে না বলেও আইনে উল্লেখ রয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম জানান, ২০২৪ সালে আইনে সংশোধন আনা হয়েছে। তাঁর মতে, সংশোধিত বিধানের আওতায় বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের বিষয়ে বার কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের কারণও ট্রাইব্যুনাল পর্যালোচনা করতে পারে।
এদিকে সালমান এফ রহমানের বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ আলাদা আবেদনও করা হয়েছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর বিষয়টি মামলার তালিকায় উঠলেও সেদিন শুনানি হয়নি। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর এ আবেদনের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
আবেদনে বলা হয়েছে, সালমান এফ রহমানের পক্ষে যুক্তরাজ্যের ডাউটি স্ট্রিট চেম্বারের আইনজীবী এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ড ও গ্রায়েম এম হল বার কাউন্সিলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। আগস্টে ই-মেইল এবং পরে লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত বার কাউন্সিল কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
এর আগে গত বছরের ১০ ডিসেম্বরও আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানের পক্ষে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের বিষয়টি ট্রাইব্যুনালে আলোচিত হয়েছিল। তখন আসামিপক্ষ জানিয়েছিল, বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের জন্য তাঁদের কিছু সময় প্রয়োজন। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এ কারণে মামলার কার্যক্রম থেমে থাকবে না।
দেড় দশকের বেশি সময়ের ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে কোনো আসামি বিদেশি আইনজীবী দিয়ে মামলা পরিচালনার সুযোগ পেয়েছেন—এমন নজির নেই। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গোলাম আযম, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষ থেকেও বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে তৎকালীন সময়ে বার কাউন্সিলের কাছ থেকে এসব আবেদনে অনুমতি বা কার্যকর সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
বর্তমান প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম অবশ্য মনে করেন, বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো ঠিক হবে না। কারণ বার কাউন্সিল আবেদনগুলোর বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।