মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার পর ইয়াবা বিভিন্ন পাহাড়ি পথ, পুরোনো সড়ক ও বিকল্প রুট ব্যবহার করে কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। পাচারকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে নিয়মিত রুট পরিবর্তন করায় সীমান্তে অভিযান চালিয়েও পুরোপুরি পাচার বন্ধ করা যাচ্ছে না।
এই পরিস্থিতিতে সীমান্ত থেকে শহর পর্যন্ত ইয়াবা পরিবহনের পথগুলোতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়াতে চায় পুলিশ। কক্সবাজার ও বান্দরবানের গুরুত্বপূর্ণ ১১টি পয়েন্টে স্থায়ী তল্লাশিচৌকি স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব চেকপোস্টে এআই-নির্ভর মুখ শনাক্তকারী ক্যামেরা, সিসিটিভি, মাদক শনাক্তকারী কুকুর, গাড়ি ও লাগেজ স্ক্যানার ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের প্রস্তাব অনুযায়ী, এসব তল্লাশিচৌকি পরিচালনায় ৩২১ জন পুলিশ সদস্য প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি অবকাঠামো ও বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম কিনতে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হয়েছে। গত ২৭ জুলাই প্রস্তাবটি পুলিশের সদর দপ্তরে পাঠানো হয়।
পুলিশের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সন্দেহভাজন মাদক কারবারিদের ছবি ও তথ্য এআই ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা হবে। তারা কোনো চেকপোস্টের আওতায় এলে ক্যামেরার মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে। গাড়ি ও লাগেজে লুকানো মাদক শনাক্তে স্ক্যানার এবং প্রয়োজনে ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করা হবে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের প্রতিবেদনে উখিয়া, টেকনাফ ও নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্ত এলাকাকে ইয়াবা প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নাফ নদী, সমুদ্রপথ এবং সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে মাদক ঢোকার পর তা বিকল্প সড়ক ও পাহাড়ি পথ ধরে দেশের ভেতরে পরিবহন করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের প্রস্তাবে কক্সবাজারের রামু, সদর, উখিয়া ও চকরিয়ার সাতটি এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির চারটি স্থানকে তল্লাশিচৌকির জন্য বাছাই করা হয়েছে। এর মধ্যে রামুর রাংকুট বৌদ্ধবিহার, পনেরো ছড়া ফরেস্ট অফিস, কক্সবাজারের ভাঙ্গার মোড়, চৌফলদণ্ডী লোহার সেতু, রেলস্টেশন, উখিয়ার কোর্ট বাজার সড়ক এবং চকরিয়ার হারবাং সড়ক রয়েছে।
১১টি চেকপোস্টের মধ্যে কক্সবাজারের ভাঙ্গার মোড়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। মেরিন ড্রাইভের শেষ প্রান্তে অবস্থিত এই এলাকায় পর্যটন ও শহরমুখী মাদক পরিবহন ঠেকাতে বড় ধরনের নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এখানে ৪২ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি ডগ স্কোয়াড, একটি লাগেজ স্ক্যানার, একটি ভেহিক্যাল স্ক্যানার, তিনটি এআই ফেস-ডিটেকশন ক্যামেরা এবং ১৫টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ১১টি তল্লাশিচৌকিতে মোট ৩১টি এআইভিত্তিক মুখ শনাক্তকারী ক্যামেরা এবং ১৪০টি সাধারণ সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। এছাড়া ছয়টি গাড়ি স্ক্যানিং মেশিন ও আটটি লাগেজ স্ক্যানার রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত বিজিবি ১ কোটি ৫১ লাখের বেশি ইয়াবা এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ৪ কোটি ৩৫ লাখের বেশি ইয়াবা জব্দ করেছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চললেও মাদক পাচারের নতুন নতুন রুট তৈরি হচ্ছে। তাই সীমান্তে প্রবেশের পর ইয়াবা যাতে দেশের অন্য এলাকায় পৌঁছাতে না পারে, সে লক্ষ্যেই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংযোগস্থলে নজরদারির বলয় তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পুলিশের এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সীমান্ত থেকে শহরমুখী বিভিন্ন পথে প্রযুক্তিনির্ভর তল্লাশি বাড়বে। তবে প্রস্তাবটি এখনো বাস্তবায়ন হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।