উপজেলা পর্যায়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ উদ্যোগের আওতায় দেশের প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন করে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাকে নির্বাচন করে অর্থায়ন ও অনুদান দেওয়া হবে।
প্রাথমিকভাবে দেশের আট জেলার ৬৪ উপজেলার তরুণ-তরুণীরা এই কর্মসূচিতে আবেদন করার সুযোগ পাবেন। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য জেলার উপজেলাগুলোকেও এর আওতায় আনা হবে।
বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
এই অর্থায়ন পেতে আগে থেকেই ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে—এমন কোনো শর্ত নেই। বাস্তবসম্মত ও সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক ধারণা থাকলেই আবেদন করা যাবে।
১৭ সেপ্টেম্বর থেকে সংশ্লিষ্ট উপজেলার তফসিলি ব্যাংকের শাখায় আবেদন গ্রহণ শুরু হবে। আবেদনকারীদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, অর্থের প্রয়োজন এবং উদ্যোগ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা যাচাই করে উদ্যোক্তা নির্বাচন করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এটি প্রচলিত কোনো প্রতিযোগিতামূলক আয়োজন নয়। বরং ব্যাংকগুলো নিজেদের বিদ্যমান শাখার মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় তরুণদের খুঁজে বের করবে। তাঁদের ব্যবসায়িক ধারণা ও প্রকৃত আর্থিক প্রয়োজন যাচাইয়ের পর অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হবে।
নির্বাচিত একজন উদ্যোক্তা তাঁর প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার অর্থায়ন প্যাকেজ পেতে পারেন। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ থাকবে ব্যাংকঋণ এবং বাকি ৫০ শতাংশ অনুদান।
গ্রাহক পর্যায়ে সুদ বা মুনাফার হার সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ঋণের জন্য কোনো সহায়ক জামানত দিতে হবে না।
তবে নির্ধারিত সময়ে ঋণের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে অনুদানের অংশ সুদবিহীন ঋণে রূপান্তরিত হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট ঋণ হিসাব প্রচলিত নিয়মে শ্রেণীকৃত হবে এবং ঋণগ্রহীতা খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। এ অবস্থায় ভবিষ্যতে নতুন ঋণ পাওয়ার যোগ্যতাও হারাতে হবে।
কর্মসূচিতে আবেদনের জন্য কয়েকটি যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। আবেদনকারীকে—
বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হতে হবে;
আবেদনের শেষ তারিখে বয়স সর্বোচ্চ ২৮ বছর হতে হবে;
যে উপজেলার জন্য আবেদন করবেন, সেই উপজেলার বাসিন্দা হতে হবে;
আগে ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক নয়;
একটি বাস্তবসম্মত ব্যবসায়িক ধারণা থাকতে হবে।
কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, মৎস্য, পশুপালন, পর্যটন, সেবা খাত কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর—সব ধরনের বৈধ উদ্যোগ এই কর্মসূচির আওতায় বিবেচিত হবে।
আবেদন করতে কোনো ফি লাগবে না। নির্ধারিত ফরমে সংশ্লিষ্ট উপজেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় আবেদন করা যাবে।
প্রথম পর্যায়ে আট বিভাগের আট জেলার ৬৪টি উপজেলায় কর্মসূচিটি চালু হচ্ছে। জেলাগুলো হলো—মানিকগঞ্জ, ফেনী, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, ভোলা, হবিগঞ্জ, রংপুর ও নেত্রকোনা।
প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন করে মোট ৬৪০ জন তরুণ উদ্যোক্তা প্রথম ধাপে নির্বাচিত হবেন। পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য উপজেলাতেও কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধাপে ধাপে প্রতিবছর প্রায় ৫ হাজার তরুণ উদ্যোক্তাকে অর্থায়ন ও অন্যান্য সহায়তার আওতায় আনা হবে।
এই উদ্যোগের আওতায় শুধু অর্থায়ন দেওয়াই হবে না। নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের জন্য উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও থাকবে।
পাশাপাশি অভিজ্ঞ পরামর্শকদের কাছ থেকে ধারাবাহিক পরামর্শ, ব্যবসা নিবন্ধন ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরির সুযোগ দেওয়া হবে।
কর্মসূচির বিস্তারিত বাস্তবায়ন নির্দেশনা ১৬ সেপ্টেম্বর জারি হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর এক মাস আবেদন গ্রহণের জন্য সময় রাখা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা, নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি এই কর্মসূচি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখবে। কারণ একজন সফল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা গড়ে তিন থেকে পাঁচজনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন। সে হিসাবে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে এই উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।