২০১৩ সালের মার্চে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফরের সময় বিএনপি চেয়ারপারসন ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকটি বাতিল হয়েছিল। হরতাল ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে ওই বৈঠক আর অনুষ্ঠিত হয়নি। ঘটনাটি সে সময় দিল্লিতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল।
১৩ বছর পর সেই ঘটনার সঠিক-ভুল বিচার নয়, বরং বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতাই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৩ সালের বিএনপি আর ২০২৬ সালের বিএনপি এক অবস্থানে নেই। তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, আর শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। ফলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে হিসাব করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
প্রশ্নটি শুধু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে যাবেন কি না—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং বড় প্রশ্ন হলো, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক কোন পথে এগোবে এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ কীভাবে সেখানে অগ্রাধিকার পাবে।
সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোতে দুই দেশের অবস্থানে কিছুটা মিলও দেখা যাচ্ছে। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভারতের সঙ্গে কার্যকর ও ভালো সম্পর্ক প্রয়োজন, তবে তা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে নয়। অন্যদিকে দিল্লির বক্তব্যেও দুই দেশের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।
অর্থাৎ সম্পর্ক ছিন্ন করা বা স্বাভাবিক করার প্রশ্নের চেয়ে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—বাংলাদেশ কী চায়, ভারত কী চায় এবং কোন কোন জায়গায় দুই দেশের স্বার্থ একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
বর্তমান বাংলাদেশ আগের তুলনায় অনেক বেশি বহুমুখী বৈদেশিক সম্পর্ক তৈরি করছে। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য, অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রয়েছে। সৌদি আরব বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক অংশীদার। তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়ছে। পাকিস্তানের সঙ্গেও দীর্ঘ বিরতির পর যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণে এ ধরনের অবস্থানকে ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ বা বহুমুখী সমন্বয় হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের স্বার্থ রক্ষা করা। তবে এতে ঝুঁকিও আছে—একটি নির্ভরতা কমাতে গিয়ে যেন নতুন কোনো দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি না হয়।
বাংলাদেশের বিকল্প অংশীদার বাড়লেও ভৌগোলিক বাস্তবতা বদলায়নি। ভারত বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্তের প্রতিবেশী। দুই দেশের মধ্যে নদী, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সরাসরি যুক্ত।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করেছে। একইভাবে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যেও বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।
তাই চীন বাংলাদেশের বড় অর্থনৈতিক অংশীদার হলেও তিস্তা বা অভিন্ন নদীর প্রশ্নে চীন ভারতের বিকল্প নয়। সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার হলেও প্রতিবেশী নয়। তুরস্ক প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিতে সহযোগী হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনা বা সীমান্ত সমস্যার অংশীদার নয়।
অর্থাৎ বাংলাদেশের বিকল্প বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু ভারত অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়নি। আবার দিল্লির জন্যও এটা মনে করার সুযোগ নেই যে বাংলাদেশের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হলো শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার দাবি। বিষয়টি কেবল দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি বিরোধ নয়; এর সঙ্গে জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ড, বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার দাবি ইতোমধ্যে ভারতের কাছে জানানো হয়েছে। ঢাকা ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে দিল্লির পক্ষ থেকে বিষয়টি তাদের নিজস্ব আইনি কাঠামোর আলোকে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য ভারসাম্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনার বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষা করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা দেশের বড় একটি অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। আবার পুরো ভারতনীতি যদি কেবল একজন ব্যক্তিকে ফেরত আনার প্রশ্নে আটকে যায়, তাহলে তিস্তা, গঙ্গা, সীমান্ত, বাণিজ্য, ভিসা, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিষয়গুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই বিচার ও প্রত্যর্পণের দাবি একদিকে চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনের জায়গায় ভারতের সঙ্গে যোগাযোগও অব্যাহত রাখা যেতে পারে।
মালদ্বীপের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েনও একটি সীমিত উদাহরণ হতে পারে। প্রেসিডেন্ট মোহামদ মুইজ্জু ক্ষমতায় এসে ভারতীয় সামরিক সদস্যদের সরানোর দাবি তুলেছিলেন। এতে দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা তৈরি হয়।
পরে আলোচনার মাধ্যমে সামরিক সদস্যদের পরিবর্তে বেসামরিক প্রযুক্তিবিদ রাখার ব্যবস্থা হয়। এরপর দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগও বাড়ে এবং অর্থনীতি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তায় সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ দেখা যায়।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি অবশ্য আলাদা। শেখ হাসিনার বিষয়টির সঙ্গে বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্ন যুক্ত থাকায় এটি অনেক বেশি গুরুতর। তবু মালদ্বীপের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় দেখায়—গুরুতর মতবিরোধ থাকলেও দুই রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া সবসময় সমাধান নয়।
বাংলাদেশের সামনে নতুন নতুন সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে প্রতিটি সুযোগ গ্রহণের আগে সম্ভাব্য লাভ ও দায়—দুই দিকই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়া আর সাধারণ অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা এক বিষয় নয়।
একটি দেশের সঙ্গে ব্যবসা করা যেমন এক ধরনের সম্পর্ক, তেমনি যৌথ নিরাপত্তা চুক্তিতে যুক্ত হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার সিদ্ধান্ত। কারণ এতে ভবিষ্যতে কোনো সদস্য রাষ্ট্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে অন্য সদস্যদের ওপরও নির্দিষ্ট দায়িত্ব তৈরি হতে পারে।
তাই বাংলাদেশের সামনে কিছু মৌলিক প্রশ্ন থাকা দরকার—বাংলাদেশ আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যরা কী করবে? ভারত-পাকিস্তান সংঘাত হলে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে? মধ্যপ্রাচ্যে বড় কোনো যুদ্ধ হলে বাংলাদেশের ওপর কী ধরনের চাপ আসতে পারে? আর পাঁচ বা দশ বছর পর পরিস্থিতি বদলে গেলে বাংলাদেশ নিজের অবস্থান পরিবর্তনের কতটা সুযোগ পাবে?
কোনো জোটে প্রবেশের আগে তাই শুধু প্রবেশের পথ নয়, প্রয়োজন হলে বেরিয়ে আসার পথও পরিষ্কার থাকা জরুরি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘স্ট্র্যাটেজিক হেজিং’। সহজ ভাষায় এর অর্থ হলো—কোনো একটি বড় শক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ধরে রাখা।
বাংলাদেশের জন্য এ কৌশল বাস্তবসম্মত হতে পারে। ভারতের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা থাকবে, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকবে, আবার মধ্যপ্রাচ্য, তুরস্ক ও অন্যান্য দেশের সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়বে।
তবে এই বহুমুখী নীতি যেন কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে জোট গঠনের চেহারা না নেয়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত সম্পর্ক বাড়ানো, কিন্তু নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বিসর্জন না দেওয়া।
বড় কোনো প্রতিরক্ষা বা নিরাপত্তা জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু সরকারের একক সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত নয়। এর সঙ্গে সংসদ, জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থ জড়িত।
একটি সরকার যে নিরাপত্তা দায় গ্রহণ করবে, ভবিষ্যৎ সরকারকেও তার প্রভাব বহন করতে হতে পারে। তাই তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিণতিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করার জন্য অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো নয়; বরং বাংলাদেশের স্বার্থে যত বেশি কার্যকর অংশীদার তৈরি করা যায়, সেটিই হতে পারে লক্ষ্য।
বাংলাদেশের বিকল্প যত বাড়বে, ভারতের সঙ্গে আলোচনায় ঢাকার দর-কষাকষির সক্ষমতাও তত বাড়তে পারে। তবে সেই বিকল্পকে দিল্লিকে চাপ দেওয়ার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে পরিস্থিতি উল্টো জটিল হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে—ভারতের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা বজায় রাখা, একই সঙ্গে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান, সৌদি আরব, তুরস্কসহ বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও বিচার প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট থাকবে। একই সঙ্গে তিস্তা, গঙ্গা, সীমান্ত, বাণিজ্য, ভিসা, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের মতো জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলোও আলাদা আলোচনার টেবিলে থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে মূল পরীক্ষা এখানেই—বাংলাদেশকে কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো নয়, বরং বাংলাদেশের জন্য যত বেশি কৌশলগত সুযোগ তৈরি করা যায়, সেই পথ খুঁজে বের করা।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বাস্তব পরীক্ষা হবে এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলা, যেখানে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়বে, কিন্তু বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা কোনোভাবেই সংকুচিত হবে না।