বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬
১৯ ভাদ্র ১৪৩৩

সদ্যপ্রাপ্ত

>> ট্রাফিক আইন ভাঙার অভিযোগে বিমানমন্ত্রীর গাড়ির বিরুদ্ধে দুই মামলা

>> ঝুট কাপড়েই সৈয়দপুরে শত কোটি টাকার পোশাকের বাণিজ্য

>> সোনাদিয়া চ্যানেলে ট্রলারডুবি, প্রাণ গেল দুই জেলের; নিখোঁজ আরও দুজন

>> তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ২০ লাখ টাকার প্যাকেজ, আবেদন করতে লাগবে যে যোগ্যতা

>> স্যাম্পল দেখেই দেশি-বিদেশি যন্ত্র বানান সৈয়দপুরের কারিগরেরা

>> বগুড়া মেডিকেলের বহির্বিভাগ বন্ধ, রোগী-স্বজনদের বিক্ষোভ

>> সাগরে আটকে রাতভর ফেরি, আড়াই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে লাগল ১৯ ঘণ্টা

>> ভারত প্রশ্নে বাংলাদেশের কৌশল কী হতে পারে?

>> মার্কিন মুদ্রায় ট্রাম্পের প্রতিকৃতি, শত বছর পর নতুন নজির

>> জানুয়ারিতে দুই পর্বে বিশ্ব ইজতেমা, তারিখ ঘোষণা

আপনি পড়ছেন : অর্থনীতি

স্যাম্পল দেখেই দেশি-বিদেশি যন্ত্র বানান সৈয়দপুরের কারিগরেরা


Rabeya ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকাল ৪:০৭



স্যাম্পল দেখেই দেশি-বিদেশি যন্ত্র বানান সৈয়দপুরের কারিগরেরা


কারখানায় ঢুকতেই চারপাশের শব্দে যেন কান ঝালাপালা হওয়ার অবস্থা। কোথাও লোহার পাত কাটার শব্দ, কোথাও হাতুড়ির আঘাত, আবার কোথাও ওয়েল্ডিংয়ের আগুনে ছড়িয়ে পড়ছে ফুলকি। মেঝেজুড়ে পড়ে আছে পুরোনো জাহাজের স্ক্র্যাপ, মরচেধরা লোহা ও বিভিন্ন ধরনের মেটাল শিট। বাইরে থেকে সাধারণ ওয়ার্কশপ মনে হলেও ভেতরে কারিগরদের কাজ দেখলে বিস্মিত হতে হয়।

কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নেই, নেই অত্যাধুনিক নকশা বা কম্পিউটারনির্ভর ডিজাইন। সামনে একটি যন্ত্রের নমুনা দিলেই সেটি দেখে প্রায় একই ধরনের যন্ত্র তৈরি করে ফেলেন তাঁরা। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও হাতে-কলমে শেখা দক্ষতাই তাঁদের প্রধান শক্তি।

নীলফামারীর সৈয়দপুরে এমন প্রায় ৫০০টি ওয়ার্কশপকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হালকা প্রকৌশলশিল্প। একসময় যেসব যন্ত্র ও যন্ত্রাংশের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হতো, তার অনেক কিছুই এখন স্থানীয় কারিগরেরা তুলনামূলক কম খরচে তৈরি করছেন। এ কারণে সৈয়দপুর পরিচিতি পেয়েছে ‘দ্বিতীয় জিনজিরা’ হিসেবেও।

একটি ওয়ার্কশপের কারিগর বলেন, মডেল বা স্যাম্পল সামনে দেওয়া হলে তাঁরা বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র তৈরি করতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে যশোর বা বগুড়া থেকে পাওয়া সাধারণ নকশা দেখেও দেশি-বিদেশি যন্ত্রের অনুরূপ মডেল তৈরি করা হয়।

বিদেশ থেকে আধুনিক কৃষি বা শিল্পযন্ত্র আমদানি করতে যেখানে তুলনামূলক বেশি অর্থ ব্যয় হয়, সেখানে সৈয়দপুরের কারিগরেরা স্থানীয় উপকরণ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে কম খরচে সেসব যন্ত্র তৈরির চেষ্টা করছেন।

রেলওয়ে কারখানা থেকেই শুরু

সৈয়দপুরের হালকা প্রকৌশলশিল্পের ইতিহাসের সঙ্গে রেলওয়ের সম্পর্ক গভীর। ১৮৭০ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের অধীনে ব্রিটিশরা সৈয়দপুরে দেশের বড় রেলওয়ে কারখানা স্থাপন করে। পরবর্তী সময়ে ওই কারখানায় কাজ করা দক্ষ শ্রমিকদের অনেকে অবসর নেওয়ার পর নিজেদের উদ্যোগে মেকানিক্যাল পার্টস তৈরির ব্যবসা শুরু করেন।

পাকিস্তান আমলে ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এসব উদ্যোগ স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। একপর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরিকে কেন্দ্র করে সৈয়দপুরে বড় একটি শিল্পবলয় গড়ে ওঠে।

স্ক্র্যাপ থেকেই তৈরি হচ্ছে নানা যন্ত্র

এই শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কাঁচামাল ব্যবহারের দক্ষতা। ভারত থেকে আমদানি করা মেটাল শিটের পাশাপাশি চট্টগ্রামের জাহাজভাঙা শিল্প থেকে পাওয়া স্ক্র্যাপ, অ্যাঙ্গেল, রড ও স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা পুরোনো লোহা ব্যবহার করে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরি করা হয়।

রেলওয়ের জন্য তৈরি হচ্ছে কানেক্টিং রড, হাউজিং, হোস পাইপ, ইঞ্জিন কভার, কাপলিং, বিয়ারিং কভারসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। ট্রেনের দরজা-জানালা ও স্ক্রু লিফটিং জ্যাকও তৈরি হচ্ছে স্থানীয় ওয়ার্কশপে।

শুধু রেলওয়েই নয়, জুট মিল, টেক্সটাইল মিল ও গার্মেন্টস কারখানার বিভিন্ন যন্ত্রাংশও তৈরি করছেন এখানকার কারিগরেরা। অটো রাইস মিলের মেশিন, পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরের যন্ত্রাংশ, রুটি ও ফুচকা তৈরির স্বয়ংক্রিয় মেশিনও তাঁদের তৈরি পণ্যের তালিকায় রয়েছে।

এমনকি বড় সেচ প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যানেল গেট তৈরির কাজও করেছেন সৈয়দপুরের কারিগরেরা।

বছরে ৩০০–৪০০ কোটি টাকার লেনদেন

বাংলাদেশ লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির জেলা সভাপতি এরশাদ হোসেন পাপ্পুর তথ্য অনুযায়ী, সৈয়দপুরে প্রায় ৫০০টি প্রতিষ্ঠান এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করছেন প্রায় ৫ হাজার মানুষ।

রেলওয়ের যন্ত্রপাতি তৈরির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ২৫টির বেশি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক উৎপাদনমূল্য ৫০ কোটি টাকার বেশি বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ রেলওয়ে স্থানীয়ভাবে তৈরি স্ক্রু লিফটিং জ্যাক কেনা শুরু করেছে। এতে বিদেশ থেকে একই ধরনের যন্ত্র আমদানির প্রয়োজন কমছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সব মিলিয়ে সৈয়দপুরের হালকা প্রকৌশলশিল্পে বছরে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। এই শিল্পের বড় ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় ও আশপাশের এলাকার কৃষক। পাশাপাশি গার্মেন্টস ব্যবসায়ী, অটো রাইস মিলের মালিক এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও নিয়মিত এখানকার ওয়ার্কশপ থেকে যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করেন।

বইয়ের জ্ঞানের বাইরে হাতে-কলমে দক্ষতা

সৈয়দপুরের কারিগরদের বড় অংশই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রকৌশল শিক্ষা নেননি। তাঁদের দক্ষতা তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিনের কাজ, অভিজ্ঞতা এবং পরিবার থেকে পাওয়া জ্ঞান দিয়ে।

এক কারখানার মালিক মিথুন জানান, তাঁর নানা ভারতের খড়গপুরে গিয়ে কাজ শিখেছিলেন। পরে সেই ব্যবসা তাঁর বাবা চালিয়েছেন এবং এখন তিনি নিজেই একই পেশায় আছেন।

আলী হোসেন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের কর্ণধার বলেন, বড় বড় সরকারি কারখানায় আধুনিক ও দামি যন্ত্রপাতি থাকলেও দক্ষ কর্মীর অভাবে অনেক সময় সেগুলোর পুরোপুরি ব্যবহার করা যায় না। তাঁর দাবি, রেল কারখানায় ক্রেন শ্যাফটের একটি পুলি ফিটিং করতে সমস্যা হলে তাঁকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি ২ হাজার ৫০০ টাকা পারিশ্রমিকে কাজটি করে দেন।

নিরাপত্তাহীনতা ও বিদ্যুৎ সংকট

সাফল্যের পাশাপাশি সৈয়দপুরের এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা ঝুঁকি। অনেক শ্রমিক প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ শব্দ, ধুলাবালি ও ভারী যন্ত্রপাতির মধ্যে কাজ করলেও তাঁদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম থাকে না। গ্লাভস ও চোখের সুরক্ষার জন্য সেফটি গ্লাস ব্যবহারের ব্যবস্থাও অনেক জায়গায় সীমিত।

স্বাস্থ্যবিমার মতো নিরাপত্তা সুবিধাও নেই বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা। দিনে দুই থেকে তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে অনেক কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়। এতে মালিকদের পাশাপাশি শ্রমিকদের আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ

দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিকভাবে চলে আসা এই ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বিগ্ন অনেক উদ্যোক্তা। শারীরিক পরিশ্রম, ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার কারণে নতুন প্রজন্মের অনেকেই এ পেশায় আসতে আগ্রহী নয়।

এক ব্যবসায়ী জানান, তাঁর ছেলে বিবিএ পড়ছেন এবং এই ব্যবসায় আসতে চান না। তাঁর মেয়েও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন। সন্তানদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় পারিবারিক এই ব্যবসার জায়গা না থাকায় পুরোনো উদ্যোক্তাদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সম্ভাবনার নতুন দরজা

তবে নানা সংকটের মধ্যেও আশার জায়গা রয়েছে। এসএমই খাতের আওতায় আসায় হালকা প্রকৌশলশিল্পের গুরুত্ব ও স্বীকৃতি বাড়ছে। এই খাতের জন্য নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তরুণদের লেদ মেশিনসহ বিভিন্ন কারিগরি কাজে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সরকারি উদ্যোগও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞতা ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কারণে সৈয়দপুরের কারিগরদের এই দক্ষতা দেশের শিল্প খাতে বড় সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। সহজ শর্তে ঋণ, সরকারি কাজের সুযোগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এই শিল্প আরও বড় পরিসরে বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

স্যাম্পল দেখে যন্ত্র তৈরির যে অনন্য দক্ষতা সৈয়দপুরের কারিগরেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ধরে রেখেছেন, যথাযথ সহায়তা পেলে সেই অভিজ্ঞতাই দেশের আমদানিনির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।