কারখানা থেকে ফেলে দেওয়া কাপড়ের টুকরা—যা সাধারণভাবে ‘ঝুট’ নামে পরিচিত—তা দিয়েই নীলফামারীর সৈয়দপুরে গড়ে উঠেছে বড় একটি পোশাকশিল্প। শীত মৌসুমে এই শিল্পের ব্যস্ততা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। দেশের বিভিন্ন এলাকার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য কম দামে শীতবস্ত্র সরবরাহের পাশাপাশি ভারত, নেপাল ও ভুটানেও এখানকার তৈরি পোশাক যাচ্ছে।
সৈয়দপুরের রেলবাজারকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই ব্যবসা এখন ছড়িয়ে পড়েছে শহরের বিভিন্ন এলাকায়। মুন্সীপাড়া, নয়াটোলা, হাতিখানা থেকে শুরু করে বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের বিভিন্ন বাড়িতেও ছোট ছোট কারখানায় চলছে পোশাক তৈরির কাজ। সেলাই মেশিনের শব্দে দিন-রাত মুখর থাকে এসব কারখানা।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, সৈয়দপুরে বর্তমানে ৫০০টির বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোশাক কারখানা রয়েছে। এর বড় একটি অংশ প্লাজা সুপার মার্কেট এলাকায়। এসব প্রতিষ্ঠানে ঝুট কাপড়সহ বিভিন্ন ধরনের অবশিষ্ট কাপড় ব্যবহার করে তৈরি করা হয় নানা পোশাক।
রিজওয়ান গার্মেন্টসের মালিক মোহাম্মদ মাসুদ হোসেনের কারখানায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন কারিগর নওশাদ আলী ও মোহাম্মদ রুবেল। তাঁদের ভাষ্য, সৈয়দপুরের তৈরি পোশাকের চাহিদা এখন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়েছে। ভারত, নেপাল ও ভুটানের পাইকারেরা সরাসরি সৈয়দপুরে এসে ট্রাকে করে পোশাক নিয়ে যান।
কারিগরেরা জানান, এসব পোশাক সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের অর্ডারে তৈরি হয় না। উন্মুক্ত পাইকারি বাজারের চাহিদা বিবেচনা করেই উৎপাদন করা হয়। শীত মৌসুমে ঢাকা, খুলনা, যশোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারেরা সৈয়দপুরে আসেন।
মৌসুমভেদে কারখানাগুলোর উৎপাদনেও পরিবর্তন আসে। শীতে জ্যাকেট, হুডি ও ব্লেজার বেশি তৈরি হলেও ঈদকে সামনে রেখে ডেনিম ও গ্যাবাডিনের প্যান্ট এবং বিভিন্ন ধরনের শার্ট তৈরি করা হয়। গরমের সময় উৎপাদন করা হয় থ্রি-কোয়ার্টার, হাফ প্যান্ট ও হালকা ট্রাউজার।
ঝুট কাপড় দিয়ে তৈরি হলেও এসব পোশাকের মান অনেক ক্ষেত্রে বাজারের অন্যান্য সাশ্রয়ী পোশাকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে। ফেলে দেওয়া কাপড় পুনর্ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন বর্জ্য কমছে, অন্যদিকে কম খরচে নতুন পোশাক তৈরি হচ্ছে।
তবে এই কাজের পেছনে রয়েছে কারিগরদের কঠোর পরিশ্রম। বড় পোশাক কারখানায় যেখানে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপ আলাদা কর্মীর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, সৈয়দপুরের অনেক কারিগরকে একাই কাটিং থেকে শুরু করে পোশাকের চূড়ান্ত সেলাই পর্যন্ত করতে হয়।
রাজু গার্মেন্টসের কারিগর সোহেল হাফিজ জানান, ঢাকার গার্মেন্টস থেকে বস্তায় করে ঝুট কাপড় আসার পর সেগুলো থেকে রং, কাপড়ের ধরন ও আকার অনুযায়ী টুকরা বাছাই করতে হয়। এই কাজেই প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা চলে যায়। একজন দিনমজুর কারিগর দিনে সর্বোচ্চ প্রায় ৩০টি পোশাক তৈরি করতে পারেন। দীর্ঘ সময় শ্রম দেওয়ার পরও তাঁদের দৈনিক আয় থাকে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা।
সময়ের সঙ্গে এই শিল্পের কাঁচামাল ব্যবহারের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। নওশাদ আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় পুরোপুরি ঝুট কাপড়ের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও বর্তমানে উৎপাদনে প্রায় ৬০ শতাংশ রোল কাপড় এবং ৪০ শতাংশ ঝুট কাপড় ব্যবহার করা হচ্ছে। কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়াকেই এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন উদ্যোক্তারা।
এক উদ্যোক্তা জানান, দুই দশক আগে প্রতি কেজি ঝুট কাপড় ৫ থেকে ৭ টাকায় পাওয়া গেলেও এখন এর দাম অনেক বেড়েছে। এর সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কাঁচামালের খরচ আরও বাড়ছে।
তারপরও সৈয়দপুরের উদ্যোক্তারা তুলনামূলক কম দামে পোশাক সরবরাহ করতে পারছেন। পাইকারি পর্যায়ে একটি ফুল প্যান্ট ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা এবং উন্নত মানের একটি জ্যাকেট প্রায় ২০০ টাকায় বিক্রি হয়। খুচরা বাজারে একই পোশাকের দাম বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা।
এসএমই ফাউন্ডেশনের সহায়তায় সৈয়দপুরে বাড়িভিত্তিক দুই শতাধিক ক্ষুদ্র পোশাক কারখানাও গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রায় ৫০০ পরিবার প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
তবে সম্ভাবনাময় এই শিল্পে উদ্যোক্তাদের বড় সমস্যা অর্থায়ন। সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ না পাওয়ায় ব্যবসার সংকটে অনেককে মহাজনের কাছ থেকে দাদন বা অগ্রিম অর্থ নিতে হয়। পরে উৎপাদন করে সেই অর্থ পরিশোধ করতে হয়।
ঋণের পাশাপাশি গ্যাসসংকটও শিল্পটির বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, গ্যাস-সংযোগ না থাকায় সৈয়দপুরে আধুনিক ওয়াশিং প্ল্যান্ট ও ডাইং কারখানা গড়ে ওঠেনি। এসব সুবিধা থাকলে পোশাকের ফিনিশিং আরও উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দামে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সৈয়দপুরের পোশাকশিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও পারিবারিক ঐতিহ্যও। অনেক কারিগর পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পেশায় যুক্ত। নওশাদ আলী ও মোহাম্মদ রুবেলের পরিবারও চার পুরুষ ধরে পোশাক তৈরির সঙ্গে জড়িত।
কারিগরদের মতে, এই শিল্পে বাঙালি ও অবাঙালি—বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে কাজ করেন। তাঁদের ভাষায়, সেলাই মেশিনের ছন্দে কর্মক্ষেত্রে বিভেদের পরিচয় অনেকটাই হারিয়ে যায়।
ফেলে দেওয়া কাপড়কে নতুন পোশাকে রূপান্তর করে সৈয়দপুরের এই শিল্প একদিকে যেমন কর্মসংস্থান তৈরি করছে, তেমনি কম দামে পোশাক সরবরাহের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের চাহিদা পূরণ করছে। পর্যাপ্ত অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত সহায়তা পেলে এই পুনর্ব্যবহারভিত্তিক শিল্পের পরিসর আরও বড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।