বাংলাদেশের জনপ্রশাসনে একদিকে কিছু কর্মকর্তার হাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, অন্যদিকে অনেক কর্মকর্তা প্রায় কাজহীন অবস্থায় রয়েছেন। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্রের কথা জানা গেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হুমায়ুন কবির বর্তমানে তিনটি দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিজ দপ্তরের কাজের পাশাপাশি তিনি জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগ এবং কমিটি ও অর্থনৈতিক অনুবিভাগের প্রধানের দায়িত্বেও রয়েছেন।
জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে সরকারের বিভিন্ন নির্দেশনা পাঠানোসহ মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের শৃঙ্খলাজনিত বিষয় দেখভালের দায়িত্ব রয়েছে জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগের। অন্যদিকে কমিটি ও অর্থনৈতিক অনুবিভাগের আওতায় সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ, এর মধ্যে ৫০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের সরকারি কেনাকাটার নথিপত্র তৈরির মতো কাজও রয়েছে।
তবে হুমায়ুন কবির নিজ উদ্যোগে এসব দায়িত্ব নেননি। সরকারের সিদ্ধান্তেই তাঁকে একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
জনপ্রশাসনে এমন অনেক কর্মকর্তাও রয়েছেন, যাঁদের নির্দিষ্ট কোনো কাজ নেই। তাঁরা বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওএসডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় শ বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে।
এ ছাড়া কিছু কর্মকর্তাকে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এসব পদে কাজের পরিমাণও খুব বেশি নয়।
জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র পাওয়া গেছে, তাতে বর্তমান সরকারে আস্থাভাজন কর্মকর্তার সংকট রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। যাঁদের ওপর আস্থা রয়েছে, তাঁদের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। আর যাঁদের ওপর আস্থা নেই, তাঁদের অনেককে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হচ্ছে।
অন্যদিকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের কেউ বাধ্যতামূলক অবসরে গেছেন, আবার অনেকে ওএসডি হয়েছেন।
গত ২৮ জুলাই একসঙ্গে ৩২ জন যুগ্ম সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তাঁদের অনেকে আগের সরকারের সময়ে জেলা প্রশাসকসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ খালেদ হাসান একসঙ্গে ব্লু ইকোনমি, সমন্বয় ও সংস্কার—এই তিনটি অনুবিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ আবদুল কাদের উন্নয়ন অনুবিভাগের পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অনুবিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পরিকল্পনা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবদুল মান্নান অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। একইভাবে বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুন নাহার অতিরিক্ত দায়িত্বে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে আছেন।
১২ আগস্টের এক অফিস আদেশে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উন্নয়ন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মনজুর আলম প্রধানকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সুরাইয়া আখতার জাহান দুটি অনুবিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এস এম আহসানুল আজিজ এবং নজরুল ইসলামও দুটি করে অনুবিভাগ সামলাচ্ছেন।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব তাহমিনা ইয়াসমিনের হাতে রয়েছে তিনটি অনুবিভাগের দায়িত্ব।
এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আয়েশা আক্তার, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মাহবুবুল হক পাটোয়ারী, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আমিনুল ইসলাম এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আবদুল ওয়াদুদ দুটি করে অনুবিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন।
জনপ্রশাসনের আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে কর্মকর্তাদের সংখ্যা ও অনুমোদিত পদের মধ্যে অসামঞ্জস্যের কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
অতিরিক্ত সচিব পদে প্রেষণসহ অনুমোদিত পদের সংখ্যা ৩৩৭টি। বিপরীতে বর্তমানে এ পর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তা প্রায় ৩৫০ জন।
যুগ্ম সচিবের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৫০২টি। কিন্তু এই পদমর্যাদায় কর্মরত কর্মকর্তার সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিভিন্ন সময়ে পদ না থাকলেও কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এবং বর্তমান সরকারের সময়ও এমন পদোন্নতি হয়েছে।
ফলে এত বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা থাকার পরও কেন একজন কর্মকর্তাকে একাধিক দায়িত্ব দিতে হচ্ছে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
জনপ্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এর পেছনে অন্যতম বড় কারণ প্রশাসনে দীর্ঘদিনের দলীয়করণের সংস্কৃতি।
তাঁদের ভাষ্য, বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের আমলেই প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি হয়েছে। তবে আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এই প্রবণতা আরও ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিযোগও ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি ও গণমুখী চরিত্র দুর্বল হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি অদক্ষতা ও অকার্যকারিতার সমস্যার কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
সংস্কার কমিশন প্রশাসনকে আরও কার্যকর ও নিরপেক্ষ করার জন্য বিভিন্ন সুপারিশ দিয়েছিল। তবে সেসব সুপারিশের বড় অংশ এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
অন্যদিকে নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতাকে প্রধান মানদণ্ড করার কথা জানিয়েছিল। পাশাপাশি কোনো কর্মকর্তাকে যেন অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা না হয়, সেটিও নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, রাজনৈতিক সরকারগুলো সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিজেদের পছন্দের কর্মকর্তাদের রাখতে চায়। এর ফলেই অনেক সময় একজন কর্মকর্তার হাতে একাধিক দায়িত্ব চলে আসে।
তাঁর মতে, একই ব্যক্তির ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব থাকলে স্বাভাবিকভাবেই সব কাজ সমান গুরুত্ব ও গতিতে সম্পন্ন করা কঠিন হয়। এর প্রভাব পড়ে সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও।
ফলে জনপ্রশাসনে বর্তমানে একদিকে অতিরিক্ত কর্মকর্তার চাপ, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে লোকবলের ঘাটতি এবং একাধিক দায়িত্বের ভার—এই তিন ধরনের সমস্যাই একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে।