লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। বিদ্যুৎ না থাকায় এক্স-রে ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ থাকছে। একই সঙ্গে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের নিয়মিত নেবুলাইজ করানোও সম্ভব হচ্ছে না। এতে দূরদূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
গত শনিবার দুপুরে হাতের আঙুলে আঘাত পাওয়ায় এক্স-রে করাতে হাসপাতালে যান রায়পুরের চরবংশী ইউনিয়নের চরমোহনা এলাকার বাসিন্দা কামরুল ইসলাম (৪৫)। প্রায় এক ঘণ্টা এক্স-রে কক্ষের সামনে অপেক্ষা করেও বিদ্যুৎ না আসায় শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা না করেই তাঁকে বাড়ি ফিরতে হয়।
কামরুল জানান, কখন বিদ্যুৎ আসবে তার কোনো নিশ্চয়তা না থাকায় বাধ্য হয়ে তিনি ফিরে যান।
লোডশেডিংয়ের কারণে শুধু পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়, জরুরি চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হচ্ছে। শনিবার হাসপাতালে ভর্তি ছিল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত চার বছরের শিশু মিনু আক্তার।
শিশুটির মা মারজান বেগম জানান, শ্বাসকষ্ট কমাতে চিকিৎসক দিনে চারবার নেবুলাইজ করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় তাঁর সন্তানকে মাত্র একবার নেবুলাইজ করাতে পেরেছেন।
কেরোয়া এলাকা থেকে সন্তানকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন মারজান।
বিদ্যুৎ না থাকায় টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে রোগীদের। চর মোহনা থেকে তিন বছরের শিশুকে টিকা দিতে হাসপাতালে এসেছিলেন সেলিনা আক্তার। কিন্তু টিকা সংরক্ষণের ফ্রিজ বিদ্যুৎ না থাকায় খুলতে না পারায় তাঁকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
সেলিনা জানান, দূর থেকে সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসে বিদ্যুৎ না থাকায় প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। এতে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যুৎ না থাকায় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। নির্ধারিত কক্ষগুলোর সামনে রোগী ও স্বজনদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর অনেকেই চিকিৎসা বা পরীক্ষা না করিয়েই ফিরে যাচ্ছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে অন্তত সাতবার লোডশেডিং হয়েছে। এতে দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা বিপাকে পড়েন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার সেখানে ৭৭ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২৩ জন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। এসব রোগীর শ্বাসকষ্ট কমাতে নেবুলাইজেশন গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিদ্যুৎ না থাকায় নিয়মিত এ সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিদ্যুৎ চলে গেলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে হাসপাতালে একটি জেনারেটর রয়েছে। তবে সেটি একজন ব্যক্তির দেওয়া হলেও জ্বালানির বরাদ্দ না থাকায় প্রয়োজনের সময় চালানো যাচ্ছে না।
হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎ চলে গেলে এক্স-রে, প্যাথলজি ও নেবুলাইজারের মতো বিদ্যুৎনির্ভর সেবাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। গত দুই থেকে তিন মাস ধরে লোডশেডিংয়ের সমস্যা আরও বেড়েছে বলেও জানান তিনি।
জরুরি বিভাগে একটি আইপিএস থাকলেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে সেটিও কার্যকর থাকে না। ফলে বিদ্যুৎনির্ভর কিছু চিকিৎসা সরঞ্জাম চালানো সম্ভব হয় না এবং জরুরি চিকিৎসাতেও এর প্রভাব পড়ে।
রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে চিকিৎসাসেবায় সমস্যা তৈরি হয় এবং রোগীদের দুর্ভোগ বাড়ে। জেনারেটর থাকলেও জ্বালানির বরাদ্দ না থাকায় সেটি চালানো যাচ্ছে না। সীমিত সুযোগের মধ্যেও রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
লোডশেডিংয়ের কারণ জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক শফিউল আলম জানান, প্রতিদিনের চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণেই লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
বিষয়টি জানিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।