সম্প্রতি ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ২০২৬’ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। যেহেতু নীতিগুলো বাস্তবায়নের আগেই বাতিল হয়েছে, তাই এর তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত হওয়ার কথা। বরং অতীতের অভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও বাস্তবসম্মত, স্বচ্ছ ও প্রমাণভিত্তিক ওষুধনীতি তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য নির্ধারণে কস্ট-প্লাস পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের দাম, জ্বালানি, শ্রম, পরিবহন ও বিনিময় হারের পরিবর্তনের সঙ্গে নিয়মিতভাবে দাম সমন্বয় না হওয়ায় অনেক ওষুধ উৎপাদন এখন কোম্পানিগুলোর জন্য কম লাভজনক বা লোকসানজনক হয়ে পড়েছে। এর ফলে কিছু প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়েছে বা বন্ধ করেছে। দীর্ঘমেয়াদে এতে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাই ওষুধের দাম নির্ধারণে একটি ভারসাম্য জরুরি। একদিকে রোগীর ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ওষুধ রাখতে হবে, অন্যদিকে উৎপাদকদেরও মানসম্মত ওষুধ টেকসইভাবে উৎপাদনের সুযোগ দিতে হবে। রোগীর স্বার্থ ও শিল্পের স্থায়িত্বকে পরস্পরবিরোধী না দেখে একই জনস্বাস্থ্যনীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নতুন অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরির সময় শুধু কোন ওষুধ বেশি বিক্রি হয় তা বিবেচনা করলে চলবে না। রোগের প্রকোপ, মৃত্যুঝুঁকি, চিকিৎসায় ওষুধটির প্রয়োজনীয়তা, কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, বিকল্প চিকিৎসার সুযোগ, ব্যয়-সাশ্রয়িতা এবং রোগীর আর্থিক চাপ—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।
এখানে ‘অত্যাবশ্যকীয়’ ও ‘জনপ্রিয়’ ওষুধের মধ্যে পার্থক্য করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ওষুধের বাজার বড় হলেই সেটি অত্যাবশ্যকীয় নয়। আবার কোনো ওষুধের চাহিদা তুলনামূলক কম হলেও জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসায় সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
শুধু জেনেরিক নাম নির্ধারণ করাও যথেষ্ট নয়। কোন ফর্মুলেশন, কত স্ট্রেংথ, শিশুদের জন্য কোন ডোজ এবং হাসপাতালে ব্যবহারের জন্য কোন ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন—এসব বিষয়ও তালিকায় স্পষ্ট করা দরকার।
বর্তমান বাস্তবতায় শুধু কাঁচামালের দাম ও নির্দিষ্ট মার্কআপ যোগ করে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ যথেষ্ট নয়। উৎপাদন ব্যয়, বিনিময় হার, কাঁচামালের আন্তর্জাতিক মূল্য এবং বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত মূল্য পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন জাতীয় ওষুধ মূল্য নির্ধারণ কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে নতুন কোনো সংস্থা তৈরি করলেই যে সমস্যার সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। অতিরিক্ত প্রশাসনিক ও কমপ্লায়েন্স ব্যয় শেষ পর্যন্ত ওষুধের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই নতুন প্রতিষ্ঠান গঠনের আগে এর প্রয়োজনীয়তা, ব্যয় ও কার্যকারিতা ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি।
অন্যদিকে ওষুধ কোম্পানিগুলোর একটি মত হলো, অন্যান্য বাণিজ্যিক পণ্যের মতো ওষুধের দামও বাজার প্রতিযোগিতার ওপর ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। তবে ওষুধ সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি একই সঙ্গে অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যপণ্য এবং অনেক ক্ষেত্রে জীবন রক্ষাকারী পণ্য। পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে রোগীদের ওপর অতিরিক্ত দামের চাপ তৈরি হতে পারে।
অতএব, সরকারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কিংবা সম্পূর্ণ মুক্তবাজার—দুটির কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার পরিবর্তে এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে রোগীর ক্রয়ক্ষমতা, উৎপাদন ব্যয়, বাজার প্রতিযোগিতা ও ওষুধের সরবরাহ—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় থাকবে।
২০২৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিলের ঘটনাকে দীর্ঘস্থায়ী নীতিগত অনিশ্চয়তায় পরিণত না করে বরং নতুন ও কার্যকর কাঠামো তৈরির সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো দরকার। প্রমাণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে আধুনিক ওষুধনীতি তৈরি করা গেলে একই সঙ্গে রোগীর স্বার্থ ও ওষুধশিল্পের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব।
লেখক: ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ
অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহ্বায়ক, অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস বাংলাদেশ