নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকা মহানগরীতে চলাচল বন্ধ থাকা ২০০৮ মডেলের সিএনজি ও পেট্রোলচালিত চার-স্ট্রোক থ্রি-হুইলার অটোরিকশার মধ্যে বাকি ৪৪টি গাড়ির ফরেনসিক পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা ১১২টি অটোরিকশার যন্ত্রাংশ ও উপকরণ প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়েছে।
বিআরটিএ’র রেজিস্ট্রেশন শাখার ২৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখের চিঠি থেকে এ তথ্য জানা গেছে। চিঠিতে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরীতে চলাচল বন্ধ থাকা ২০০৮ মডেলের মোট ১১২টি সিএনজি/পেট্রোলচালিত চার-স্ট্রোক থ্রি-হুইলার অটোরিকশার যন্ত্রাংশ ও উপকরণ প্রতিস্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে এসব গাড়ির মধ্যে ৪৪টির ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বর অস্পষ্ট থাকায় ফরেনসিক পরীক্ষার বিষয়টি এতদিন আটকে ছিল।
এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখের চিঠির সূত্র উল্লেখ করে বিআরটিএ জানিয়েছে, বাকি ৪৪টি অটোরিকশার ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে গ্যারেজে পরে গাড়ি
অটোরিকশার মালিকদের অভিযোগ, ২০০৮ মডেলের এসব গাড়ির নির্ধারিত আয়ুষ্কাল প্রায় আড়াই বছর আগেই শেষ হয়েছে। কিন্তু সময়মতো প্রতিস্থাপন বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে গাড়িগুলো গ্যারেজে পড়ে রয়েছে।
গাড়ি রাস্তায় চালাতে না পারলেও অনেক মালিককে প্রতিমাসে প্রতিটি গাড়ির জন্য প্রায় ৩ হাজার টাকা করে গ্যারেজ ভাড়া দিতে হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এতে দীর্ঘ সময় ধরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পরেছেন তাঁরা।
জীবিকা হারিয়ে বিপাকে মালিকরা
২০০৮ মডেলের এসব অটোরিকশার অনেক মালিক নিজেরাই গাড়ি চালিয়ে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করতেন। ফলে গাড়ি বন্ধ থাকায় তাঁদের নিয়মিত আয়ও বন্ধ হয়ে যায়।
মালিকদের ভাষ্য, সময়মতো প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা না হওয়ায় অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছে। কারও সন্তানের পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে, আবার কেউ ধারদেনা করে সংসারের খরচ চালিয়েছেন।
তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিনের এই সমস্যার দ্রুত সমাধান করে অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় গাড়িগুলো প্রতিস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হোক।
ফরেনসিক পরীক্ষা কোথায় হবে?
৪৪টি অটোরিকশার ফরেনসিক পরীক্ষা এখন কীভাবে এবং কোথায় করা হবে- এটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পরিবহনসংশ্লিষ্ট কয়েকজন বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বর অস্পষ্ট থাকা গাড়িগুলোর ক্ষেত্রে পরীক্ষাটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) অথবা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরীক্ষা করানো যেতে পারে।
তাদের মতে, নিরপেক্ষ ও প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হলে গাড়িগুলোর প্রকৃত ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বর শনাক্তকরণ এবং সংশ্লিষ্ট নথির সঙ্গে মিল যাচাই করা সহজ হবে।
আগের পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়েও প্রশ্ন
এর আগে কয়েকটি সিএনজি অটোরিকশার ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে ওই পরীক্ষায় কী ধরনের প্রযুক্তি বা সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছিল এবং পরীক্ষার ফলাফল কী- তা নিয়েও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের দাবি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৪৪টি গাড়ির ক্ষেত্রে একই ধরনের বৈজ্ঞানিক ও নিরপেক্ষ পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি। এতে ভবিষ্যতে পরীক্ষা বা অনুমোদন নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠার সুযোগ কমবে।
মালিকদের প্রত্যাশা দ্রুত সমাধান
দীর্ঘদিন ধরে গাড়ি বন্ধ থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত মালিকরা বলছেন, ফরেনসিক পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় যাচাই দ্রুত শেষ করে ২০০৮ মডেলের এসব অটোরিকশার প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা দরকার।
তাদের দাবি, শুধু অনুমতি দেওয়াই নয়, পরীক্ষার পরবর্তী ধাপগুলোও দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। এতে একদিকে দীর্ঘদিনের জটিলতার অবসান হবে, অন্যদিকে গাড়িগুলোর ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো আবারও জীবিকার সুযোগ ফিরে পাবে।
এখন মূল অপেক্ষা ৪৪টি অটোরিকশার ফরেনসিক পরীক্ষা কত দ্রুত এবং কোন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, তা দেখার।
উল্লেখ্য ২০০১ থেকে ২০০৬ মডেলের সিএনজি প্রতিস্থাপনে ১১২ কোটি টকা ঘুষ বানিজ্য হয়েছে মর্মে একটি অভিযোগ দুদকে তদন্তনাধীন রয়েছে।