দেশের অন্যতম প্রধান সংরক্ষিত ও স্পর্শকাতর সামরিক ধাঁচের প্রতিরক্ষা এলাকা রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে রাতের আঁধারে বহিরাগত নারী এনে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পুলিশ টেলিকমের পরিদর্শক (নিঃ) মোঃ রেজাউল করিমের (বিপি-৮১০৭১১৫৮৯০) বিরুদ্ধে। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর প্রাথমিক বিভাগীয় শাস্তি হিসেবে তাকে গত ২০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে পুলিশ টেলিকমের 'ট্রেনিং শাখায়' বদলি করা হয়েছে। তবে বাহিনীটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী এমন জঘন্য ও প্রশাসনিক অপরাধের ক্ষেত্রে বিভাগীয় মামলা বা বরখাস্ত না করে কেবল দপ্তর পরিবর্তনের মাধ্যমে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ সাধারণ পুলিশ সদস্যরা।
২৯ জুলাইয়ের রাতের আঁধার ও ১ নম্বর গেটের চাঞ্চল্যকর আটক
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের ০১ নম্বর (আব্দুস সালাম) গেটে দায়িত্ব পালনকালে সকাল ৭:৫০ মিনিটের দিকে কালো বোরকা পরা এক নারীকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বেরিয়ে যেতে দেখে ডিউটিরত পুলিশ কনস্টেবল পারভেজ আলীর সন্দেহ হয়। নারীটিকে থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি অসঙ্গতিপূর্ণ উত্তর দেন। পরবর্তীতে নায়েক জিন্নাহ বিষয়টি বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে এলপি কোম্পানীর সহ-অধিনায়ক এসআই (সশস্ত্র) মোঃ সাহাব উদ্দিনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেন।
ঘটনাস্থলে এসআই সাহাব উদ্দিনের উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসাবাদে আটক নারী জানান, তার নাম মোছাঃ তানজিলা আক্তার আয়েশা, বাড়ি পটুয়াখালী জেলায়। আটককৃত নারী জবানবন্দিতে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, আগের দিন রাত ১১:০০ টার দিকে পুলিশ টেলিকমে কর্মরত পরিদর্শক মোঃ রেজাউল করিম এবং অপর এক এসআই তাকে ৫,০০০ (পাঁচ হাজার) টাকার বিনিময়ে অনৈতিক উদ্দেশ্যে রাজারবাগের নতুন ২০ তলা ভবনের ৭ম তলায় নিয়ে যান। সারারাত অবস্থানের পর সকালে তাকে ৪,০০০ টাকা দিয়ে দ্রুত পুলিশ লাইন্স ত্যাগ করতে বলা হয়।
ঘটনাটি জানাজানি হলে আটক নারী পরিদর্শক রেজাউল করিমকে ফোনে বিষয়টি জানান। খবর পেয়ে রেজাউল করিম দ্রুত ১ নম্বর গেটে উপস্থিত হয়ে আটক নারীকে 'নিজের বোন' পরিচয়ে জোরপূর্বক ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে বিষয়টি সেখানে দায়িত্বরতদের কঠোর ভূমিকার কারণে ব্যর্থ হয় এবং পরবর্তীতে সহকারী পুলিশ কমিশনার (ফোর্স)-এর নির্দেশে ওই নারীর লিখিত জবানবন্দি গ্রহণপূর্বক তাকে পুলিশ লাইন্স থেকে বের করে দেওয়া হয়।
ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের প্রতিবেদন ও 'বদলি নাটক'
উক্ত ঘটনার সমস্ত বিবরণ উল্লেখ করে গত ৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে এসআই মোঃ সাহাব উদ্দিন উপ-পুলিশ কমিশনার (ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড ফোর্স)-এর নিকট একটি লিখিত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও স্পর্শকাতর পুলিশ লাইন্সের ভেতরে এ ধরনের অনৈতিক কাজ বাহিনীর শৃঙ্খলার চরম পরিপন্থী এবং গোটা বাংলাদেশ পুলিশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) প্রাথমিক প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে গত ২০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে পুলিশ টেলিকমের অ্যাডিশনাল আইজিপি মোঃ মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে (পত্র নম্বর) পরিদর্শক মোঃ রেজাউল করিমকে বর্তমান পদ থেকে সরিয়ে 'ট্রেaning শাখায়' বদলি করা হয়। পরবর্তীতে লজিস্টিকস শাখার পুলিশ সুপার শাহরিয়ার বিন সালেহ আদেশের অনুলিপি বাস্তবায়নের জন্য সকল শাখায় প্রেরণ করেন।
বাংলাদেশ সরকারের আইন কি বলছে পতিতা বৃত্তির বিষয়ে?
দেশের প্রচলিত আইন ও চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, রাজারবাগের মতো একটি স্পর্শকাতর ও সরকারি সংরক্ষিত এলাকায় অনৈতিক উদ্দেশ্যে বহিরাগত প্রবেশ করানো এবং অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়া স্পষ্টত গুরুতর অপরাধ। ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৪৭ ধারা অনুযায়ী, সংরক্ষিত চত্বরে অনৈতিক উদ্দেশ্যে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ বা অবস্থান করানো সরাসরি ‘অবৈধ প্রবেশ’ (Criminal Trespass) হিসেবে গণ্য, যার শাস্তি সর্বোচ্চ ৩ মাসের কারাদণ্ড বা জরিমানা। এছাড়া একই আইনের ২৯০ ও ২৯৪ ধারায় সরকারি চত্বরে শৃঙ্খলা ও পরিবেশ বিনষ্টকারী অশ্লীল কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং ১০৯ ধারা অনুযায়ী সরকারি পদে থেকে অপরাধে সহায়তা বা প্রভাব খাটিয়ে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টার সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান রয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) অধ্যাদেশ ১৯৭৬-এর ৭৪ ও ৭৬ ধারা মতে, সংরক্ষিত এলাকায় অনৈতিক কাজে নারী সরবরাহ, আশ্রয় প্রদান কিংবা আইনশৃঙ্খলা বিরোধী আচরণ সরাসরি গ্রেপ্তার ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অন্যান্য সাধারণ অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ যেখানে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেয়, সেখানে একজন দায়িত্বশীল পরিদর্শকের বিরুদ্ধে এমন অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও অপরাধ দমন না করে কেবল দপ্তর বদল নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ এবং ‘বেঙ্গল পুলিশ রেগুলেশন (PRB)’ অনুযায়ী সরকারি আবাসন ব্যবহার করে এমন অনৈতিক কার্যকলাপ চরম ‘গুরুতর কদাচার’ (Misconduct)-এর শামিল। এই বিধিমালার আওতায় অপরাধ প্রমাণিত হলে বরখাস্ত (Dismissal), অবনমন (Demotion) বা বাধ্যতামূলক অবসরের স্পষ্ট বিধান রয়েছে। অথচ এ ধরনের আইনি ও বিভাগীয় অপরাধের ক্ষেত্রে কেবল এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ‘বদলি’ কোনো আইনি শাস্তি হতে পারে না; বরং এটি অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়ারই নামান্তর।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, পরিদর্শক রেজাউল করিমের অপকর্মের তালিকা কেবল এই নারী সংক্রান্ত ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পুলিশ টেলিকমে কর্মরত অবস্থায় তার ও তার সহযোগী বেতার কনস্টেবল সোহাগের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে কোটি টাকার বদলি বাণিজ্য, অনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও সরকারি বাসভবনের অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
বদলি সিন্ডিকেট: ওসি (এমটি) পদে থাকাকালে পরিদর্শক রেজাউল সাবেক উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। সাধারণ পুলিশ সদস্যদের ইচ্ছামতো বদলি করে জনপ্রতি ৪০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা এবং জাতীয় জরুরি সেবা-৯৯৯ থেকে স্থানান্তরের জন্য ৮০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত ঘুস নিতেন। পরবর্তীতে কৌশলে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'আরওআই' (ROI) পদটি বাগিয়ে নেন।
রাজনৈতিক রঙ বদল: বিগত সরকারের আমলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ও প্রভাবশালী নেতাদের নাম ব্যবহার করে তিনি চরম বেপরোয়া আচরণ করতেন। শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য পূর্বে বিভাগীয় শাস্তির মুখোমুখি হলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজেকে বিএনপি পন্থী হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করেন। তবে ডিএমপির শিরু মিয়া অডিটোরিয়ামে সাধারণ পুলিশের সমন্বয়করা তাকে চিনতে পেরে ধাওয়া দিয়ে বের করে দেন।
নারী সরবরাহকারী ও কোয়ার্টার অপব্যবহার: বর্তমানে স্ত্রী না থাকা সত্ত্বেও রাজারবাগ পুলিশ কোয়ার্টার নিজের নামে বরাদ্দ রেখে অপরাধের অভয়ারণ্য বানিয়েছেন রেজাউল। এমটি শাখার বেতার কনস্টেবল সোহাগ সরাসরি তার জন্য নারী সরবরাহের কাজটি পরিচালনা করতেন। এর আগে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় সরকারি গাড়ি অবৈধভাবে ভাড়ায় খাটিয়ে অর্থ উপার্জনের অপরাধে তিনি সাময়িক বরখাস্তও হয়েছিলেন।
'বদলি কি শাস্তি হতে পারে?'— ভুক্তভোগীদের তোপ ও বিচারিক প্রশ্ন
বিভাগীয় শাস্তির নামে কেবল এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে স্থানান্তর বা 'ট্রেনিং শাখায় বদলি'র এই আদেশে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষুব্ধ ও ভুক্তভোগী পুলিশ সদস্যদের মাঝে। পুলিশের অভিজ্ঞ মহলের প্রশ্ন—আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোয়ার্টারে বহিরাগত নারী এনে অনৈতিক কাজ, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার ও কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের মতো গুরুতর অপরাধের শাস্তি কীভাবে কেবল 'বদলি' হয়?
ক্ষতিগ্রস্ত পুলিশ সদস্যরা সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে লিখিত আবেদনে জানান, পরিদর্শক রেজাউল ও কনস্টেবল সোহাগকে কেবল স্থানান্তরিত করে অপরাধ প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। তাদের অবিলম্বে চাকরিচ্যুত করে বিভাগীয় ও ফৌজদারি আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত পরিদর্শক মোঃ রেজাউল করিমের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার ব্যবহৃত সরকারি ও ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ঘটনাটি নিয়ে এখন পুলিশ সদর দপ্তরের শীর্ষ পর্যায় থেকে চূড়ান্ত কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে গোটা পুলিশ বাহিনী।