রংপুর নগরের কামালকাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় দুই তরুণকে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে ওই পরিবারের চারজনকে হত্যা করা হয়। পরে ঘটনাটি ডাকাতি হিসেবে দেখাতে ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করে রাখা হয়।
রোববার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।
আটক দুজন হলেন সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩)। তাঁরা পরস্পরের মামাতো-ফুফাতো ভাই। রোববার ভোরে নগরের দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাঁদের আটক করা হয়। তাঁদের বাড়ি নিহত পরিবারের বাড়ির কাছেই।
পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর নির্মাণাধীন বাড়ির তৃতীয় তলার ছাদে যান। সেখানে তাঁরা ইয়াবা সেবন করছিলেন বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।
শব্দ শুনে সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে তাঁদের ইয়াবা সেবনে বাধা দেন। এ সময় তাঁকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
গণপতির চিৎকার শুনে তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০) ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করলে সিঁড়িতে তাঁকে হত্যা করা হয়। পরে মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) সেখানে গেলে তাঁকেও হত্যা করা হয়। ঘরে ঘুমিয়ে থাকা ১৩ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকেও শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ বলছে, নিহতদের সঙ্গে আটক দুই তরুণের আগে থেকেই পরিচয় ছিল। নিজেদের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই তাঁরা পরিবারের চার সদস্যকে একে একে হত্যা করেন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।
শনিবার রাতে ওই বাড়ির দ্বিতীয় তলা থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী ও ছেলে আয়ুশের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের পরও কিছু সময় ওই বাড়িতে অবস্থান করেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। পুলিশের দাবি, সেখানে তাঁরা গোসল করেন, ফ্রিজ থেকে খেজুর ও শসা খান এবং ইয়াবা সেবন করেন। পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের সময় লোকজনের চলাচল কম থাকায় তাঁরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান।
বের হওয়ার আগে আলমারি ও ড্রয়ার খুলে কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে রাখা হয়। পুলিশের ধারণা, ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর জন্যই এমনটি করা হয়েছিল।
তদন্তকারীরা ঘরের টেবিলে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম পান। পাশাপাশি একটি স্বর্ণের চুড়ি আগুনে পরীক্ষা করার চেষ্টার আলামতও পাওয়া যায়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে শনাক্ত করে।
পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে আটক দুজন হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিহত পরিবারের লুট হওয়া স্বর্ণালংকার একটি পরিত্যক্ত স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, নিহত শিক্ষকের দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল। আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে এমনটি করা হয়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া ঘর থেকে উদ্ধার করা খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
আটক মুগ্ধ নগরের সিটি বাজারের একটি মাছের দোকানে কাজ করেন। আর সিদ্ধার্থ প্রায় আট বছর ধরে একটি জুয়েলারি দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করছেন।
রংপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ কে এম নাজমুল কাদের জানিয়েছেন, এ ঘটনায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে একই পরিবারের চারজন হত্যার প্রতিবাদে রোববার রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেন। তাঁরা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।