ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মণিপুর ও নাগাল্যান্ডে নাগা এবং কুকি-জো সম্প্রদায়ের সংঘাত দিন দিন আরও জটিল আকার ধারণ করছে। ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সহিংসতায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। সংঘর্ষের প্রভাব পড়েছে নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও। গত এক সপ্তাহে আসাম রাইফেলসের ওপর দুটি পৃথক হামলায় তিনজন সদস্য নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার রাতে মণিপুরের সেনাপতি জেলায় আসাম রাইফেলস একটি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় জনতা নিরাপত্তা বাহিনীর অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করে। পরে বিক্ষুব্ধ লোকজন একটি ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে পাথর নিক্ষেপ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করে। এ সময় সেনাবাহিনীর কয়েকটি যানবাহনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রশাসনের দাবি, নিরাপত্তা বাহিনী জনতার ওপর গুলি চালায়নি এবং সংঘাত এড়াতে পিছু হটে। তবে পরে হামলার ঘটনা আরও বড় আকার ধারণ করে।
এর আগের দিন নাগাল্যান্ডের চুমৌকেডিমা এলাকায় একটি বিস্ফোরণে আসাম রাইফেলসের একজন সদস্য নিহত হন। আহত হন আরও কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী ও একজন বেসামরিক ব্যক্তি।
প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, রাস্তার পাশে রাখা একটি অটোরিকশায় বিস্ফোরক রেখে দূরনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বিস্ফোরণের তীব্রতায় যানটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের হামলা দীর্ঘদিন পর নাগাল্যান্ডে দেখা গেল এবং এটি অত্যন্ত পরিকল্পিত নাশকতার ইঙ্গিত বহন করে।
এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন নাগাল্যান্ডের মুখ্যমন্ত্রী নেইফিউ রিও, রাজ্যপাল নন্দকিশোর যাদব এবং শান্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠন।
এরও এক সপ্তাহ আগে, ৬ জুলাই মণিপুরের উখুরুল জেলায় আসাম রাইফেলসের একটি গাড়িবহরে অতর্কিত হামলা চালায় সন্দেহভাজন সশস্ত্র গোষ্ঠী। ওই ঘটনায় দুই নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন। পরে এলাকাজুড়ে বড় ধরনের তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করা হয়।
স্থানীয় সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা দীর্ঘ সময় ধরে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং তাদের অস্ত্রশস্ত্রের পরিমাণ নিরাপত্তা বাহিনীকেও বিস্মিত করেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক মাসের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে কুকি-জো সম্প্রদায়ের অন্তত ১৫ জন, নাগা সম্প্রদায়ের ১১ জন এবং বাকি কয়েকজন অন্যান্য সম্প্রদায় ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।
পর্যবেক্ষকদের মতে, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নাগা ও কুকি-জো জনগোষ্ঠীর বিস্তৃত উপস্থিতির কারণে সংঘাত একাধিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও সংঘর্ষের মধ্যে পড়তে হচ্ছে।
সংঘাতের জেরে নাগাল্যান্ডের ডিমাপুর ও মণিপুরের ইম্ফলকে সংযুক্ত করা জাতীয় মহাসড়ক-২-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ টানা ৮৭ দিন ধরে অবরুদ্ধ রয়েছে। এতে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সংকট দেখা দিয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মণিপুরের উখুরুল জেলায় একটি সামান্য বিরোধ থেকে নাগা-কুকি উত্তেজনার সূচনা হয়। পরে মে মাসে নাগা সম্প্রদায়ের ছয়জনকে অপহরণের অভিযোগ ওঠে এবং জুনে তাদের মরদেহ উদ্ধার হলে পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটে।
এর প্রতিবাদে ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল জাতীয় মহাসড়ক-২-এ অর্থনৈতিক অবরোধ শুরু করে। এর ফলে কুকি অধ্যুষিত কাংপোকপি জেলায় খাদ্য ও জরুরি পণ্যের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। কুকি ইনপি মণিপুরের দাবি, অনেক মানুষ খাদ্যের অভাবে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শাকসবজি, ভুট্টা, কুমড়া ও বুনো খাদ্যের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।
মেইতেই সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠনও নাগাদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তারা নাগা হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তার, কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল এবং কুকি সম্প্রদায়ের উপমুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছে।
অন্যদিকে, ২০২৩ সাল থেকে চলমান মেইতেই-কুকি সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে মেইতেই সংগঠনগুলো ১৯৫১ সালকে ভিত্তি ধরে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) বাস্তবায়নের দাবিও জানিয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মে মাস থেকে মেইতেই ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের সংঘর্ষে ২৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। উত্তর-পূর্ব ভারতের চলমান এই অস্থিরতা সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলছে।