বুধবার প্রকাশিত সংস্থাটির অর্ধবার্ষিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এইচআরএসএস জানায়, জাতীয় পর্যায়ের ১৬টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ এবং অনুসন্ধানী পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরের প্রথম ছয় মাসে ৮৩০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এতে নিহত ৫৬ জনের মধ্যে বিএনপির ৩৭ জন, জামায়াতের ৬ জন, আওয়ামী লীগের ৩ জন, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ৮ জন, একটি চরমপন্থী সংগঠনের একজন সদস্য এবং একজন সাধারণ নারী রয়েছেন।
সংস্থাটির দাবি, এসব ঘটনার প্রায় ৮১ শতাংশ বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ অথবা বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে ঘটেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৩৯৬টি সহিংস ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ২ হাজার ৫৭৮ জন আহত হয়েছেন। পাশাপাশি নির্বাচন-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে ৬০০টির বেশি বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ, আধিপত্য বিস্তার এবং বিভিন্ন বিরোধকে কেন্দ্র করে ২৬১টি মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত এবং ২৫৬ জন আহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় ছয় মাসে ১৪৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ৩ হাজার ২৬৮ জনকে নামীয় এবং ২৪ হাজার ৫১৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্তত ৩ হাজার ৬৭ জন নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন।
এইচআরএসএসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৪০টি সভা-সমাবেশে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাধা দিয়েছে। এতে ৩১১ জন আহত এবং ৩৮ জনকে আটক করা হয়েছে।
এ ছাড়া ছয় মাসে সাংবাদিকদের ওপর ২০০টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এতে ৩৮৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২৩৪ জন, লাঞ্ছিত হয়েছেন ৬০ জন, হুমকি পেয়েছেন ৪৯ জন এবং আটক হয়েছেন ১১ জন। একই সময়ে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর আওতায় ১৫টি মামলায় ৩৩ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫০টি হামলায় ৫৬ জন আহত হয়েছেন। এ সময় ১৯টি মন্দির, ১৫টি প্রতিমা এবং ৪৩টি বসতবাড়িতে হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি জমি দখলের কয়েকটি ঘটনা এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এক নারী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হওয়ার তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৩২টি ঘটনায় ৯ জন নিহত ও ৩৫ জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া ৩৮ জনকে আটক এবং ১৭৩ জনকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর (পুশ-ইন) ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। মিয়ানমার সীমান্তে পৃথক ঘটনায় একজন নিহত, পাঁচজন আহত এবং স্থলমাইন বিস্ফোরণে ছয়জনের মৃত্যুর তথ্যও দেওয়া হয়েছে।
এইচআরএসএস জানায়, বছরের প্রথম ছয় মাসে ১ হাজার ৬২১ জন নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪০৪ জন ধর্ষণ, ৮৮ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর ১৭ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। একই সময়ে ১ হাজার ৭৭ জন শিশুর ওপর নির্যাতনের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
প্রতিবেদনের শেষে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে আইনের শাসন সুসংহত করা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।