সোমবার, আগস্ট ৩১, ২০২৬
১৬ ভাদ্র ১৪৩৩

সদ্যপ্রাপ্ত

>> মাগুরায় শিশুধর্ষণ–হত্যা: হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল

>> জনপ্রশাসনে কারও হাতে একাধিক দায়িত্ব, আবার কারও নেই কোনো কাজ

>> যুক্তরাষ্ট্র–ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা, হরমুজ প্রণালিতে দিনে মাত্র ৫ জাহাজ

>> ইরানের সঙ্গে লেনদেন, আরও একটি ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

>> মাদ্রাসার ৫ম ও ৮ম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার ফরম পূরণ শুরু ২ সেপ্টেম্বর

>> ইউএস ওপেনের প্রথম রাউন্ডেই বিদায় জোকোভিচের

>> ‘বোহেমিয়ান ঘোড়া ২’ নিয়ে ফিরছেন অমিতাভ–মুশফিকা, নির্মাণ করবেন আরও দুই সিনেমা

>> মা-বাবার কষ্ট দেখেই বড় স্বপ্ন, এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া চার শিক্ষার্থীর লড়াই

>> পাকিস্তানের এখন জয়ের চেয়ে হার বেশি, অন্য দলগুলোর অবস্থান কী?

>> যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে বাংলাদেশ

আপনি পড়ছেন : শিক্ষা

মা-বাবার কষ্ট দেখেই বড় স্বপ্ন, এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া চার শিক্ষার্থীর লড়াই


Rabeya ৩১ আগস্ট ২০২৬, সকাল ১১:৩৬



মা-বাবার কষ্ট দেখেই বড় স্বপ্ন, এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া চার শিক্ষার্থীর লড়াই


অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা চার শিক্ষার্থী এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। পরিবারের আর্থিক সংকট তাঁদের পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেও মা-বাবার কষ্ট তাঁদের স্বপ্নপূরণের অনুপ্রেরণা দিয়েছে।

কেউ বাবাকে সংসারে সহযোগিতা করেছে, কেউ নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই জোগাড় করেছে। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ভালো ফল অর্জনের পর এখন তাঁদের সামনে উচ্চশিক্ষার নতুন অধ্যায়। তবে অর্থের অভাবে সেই পথ কতটা এগোতে পারবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবার।

চিকিৎসক হতে চায় শারমিন

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার হাজীপুর গ্রামের শারমিন আক্তার ইকরচালী বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে।

পাঁচ সদস্যের পরিবারের শারমিনের বাবা সিরাজুল ইসলাম দিনমজুর। মা মনজিলা বেগম গৃহিণী। বসতভিটা ও ২০ শতক আবাদি জমিই পরিবারের প্রধান সম্পদ। নিজেদের জমিতে চাষাবাদ করেও সংসারের খরচ মেটানো কঠিন হওয়ায় তাঁর বাবা অন্যের জমিতেও দিনমজুরি করেন।

সংসারের এই সংকটের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছে শারমিন। নিজের পড়ার খরচ মেটাতে গ্রামের ছোট শিশুদের পড়িয়েছে সে।

শারমিনের স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়া। তবে কলেজে ভর্তি ও পরবর্তী পড়াশোনার খরচ নিয়ে সে উদ্বিগ্ন। তার ভাষায়, বাবার পক্ষে উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহন করা কঠিন। সহযোগিতা পেলে সে নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যেতে চায়।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জুলফিকার ইসলাম বলেন, দরিদ্র পরিবারের সন্তান হলেও শারমিন অত্যন্ত মেধাবী। প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে ভবিষ্যতে সে ভালো কিছু করতে পারবে।

বাবাকে হারিয়েও থামেনি সুসমিতার পথচলা

ছোট বয়সেই বাবাকে হারিয়েছে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ভুইয়ট গ্রামের সুসমিতা রানী মাহাতো। মাকে সঙ্গে নিয়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছে সে।

তাড়াশ উপজেলার বিষমডাঙা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সুসমিতা এবার এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাঁর ফলাফলে পরিবারে আনন্দ এলেও উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশোনার খরচ নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে।

সুসমিতাদের পরিবারের সম্পদ বলতে দাদার সামান্য আবাদি জমি। তাঁর কাকা অনিল চন্দ্র মাহাতো সেই জমি চাষ করেন। সেখান থেকে পাওয়া আয়েই কোনোভাবে পরিবারের ব্যয় চলে।

সুসমিতার মা শিল্পী রানী মাহাতো জানান, ছোটবেলা থেকেই মেয়েটি পড়াশোনায় মনোযোগী। কিন্তু কলেজের খরচ জোগানো তাঁদের জন্য কঠিন হবে।

সুসমিতার লক্ষ্য উচ্চমাধ্যমিকেও ভালো ফলের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। তবে আর্থিক সংকট তাঁর সেই স্বপ্নের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইজিবাইকচালক বাবার সন্তান দিপ্ত

নীলফামারী কালেক্টরেট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী দিপ্ত চন্দ্র রায় এসএসসিতে সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। ভবিষ্যতে চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করতে চায় সে।

কিন্তু দিপ্তর বাবা দ্বিজেন্দ্র নাথ রায় ইজিবাইক চালিয়ে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করেন। পরিবারের একমাত্র উল্লেখযোগ্য সম্পদ ছয় শতাংশের বসতভিটা। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাতে তাঁকে ঋণও করতে হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে ঋণের কিস্তি দিতে হচ্ছে প্রায় তিন হাজার টাকা।

দিপ্তর বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার। অর্থ সাশ্রয়ের জন্য প্রতিদিন হেঁটেই স্কুলে যাতায়াত করেছে সে। টিফিনের সময় অন্য শিক্ষার্থীরা খাবার কিনে খেলেও অনেক দিন অর্থের অভাবে তাকে না খেয়েই থাকতে হয়েছে।

দিপ্ত ঢাকার নটর ডেম কলেজে পড়তে চায়। কিন্তু সেই কলেজে পড়ার খরচ কীভাবে জোগাড় হবে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন সে ও তার পরিবার।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মো. সাদেকুল ইসলাম জানান, দিপ্ত মেধাবী ও ভদ্র শিক্ষার্থী। তাকে প্রতিষ্ঠান থেকে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সহায়তা পেলে তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

পড়ার ফাঁকে কাজ করত কাশফিয়া

নীলফামারীর সৈয়দপুর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী কাশফিয়া নুরইনও এসএসসিতে সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে।

পড়াশোনার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল ছোটবেলা থেকেই। টিফিনের সময় অন্যরা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকত, তখন কাশফিয়াকে প্রায়ই বই নিয়ে বসে থাকতে দেখা যেত।

সৈয়দপুর শহরের মিস্ত্রিপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় পরিবারের সঙ্গে থাকে কাশফিয়া। বাবা নাসিম আহমেদ ছোট একটি পান দোকান চালান। মা ফারজানা বেগম গৃহিণী। পরিবারের আর্থিক সহযোগিতার জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি দর্জির দোকানে তৈরি পোশাকে বোতাম লাগানোর কাজও করেছে কাশফিয়া।

ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন তার। ভালো ফলের পেছনে শিক্ষক ও বাবা-মায়ের অবদানের কথা উল্লেখ করে কাশফিয়া জানায়, পরীক্ষার সময় তার মা রাত জেগে পাশে থাকতেন। অনেক সময় বাবা-মা নিজেদের প্রয়োজন কমিয়ে তার খাবার ও পড়াশোনার দিকে নজর দিয়েছেন।

বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কাশফিয়া তাঁদের প্রতিষ্ঠানের অন্যতম মেধাবী শিক্ষার্থী। পড়াশোনার বিষয়ে সে অত্যন্ত মনোযোগী এবং ভবিষ্যতে অনেক দূর যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে মেয়ের উচ্চশিক্ষার খরচ জোগানো সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন কাশফিয়ার বাবা।

স্বপ্ন বড়, প্রয়োজন সহযোগিতা

এই চার শিক্ষার্থীর গল্প আলাদা হলেও তাঁদের জীবনের বাস্তবতা প্রায় একই। পরিবারের আর্থিক সংকট তাঁদের থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং মা-বাবার সংগ্রাম তাঁদের আরও মনোযোগী করেছে।

এসএসসিতে সাফল্যের পর এখন তাঁদের প্রত্যেকের চোখ উচ্চশিক্ষার দিকে। কেউ চিকিৎসক হতে চায়, কেউ ভালো ফলের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চায়। কিন্তু অর্থের অভাব যেন তাঁদের স্বপ্নের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

মেধা ও পরিশ্রমের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে এই শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।