বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছেন। তবে এসব দেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কারিগরি দক্ষতা ও অন্যান্য প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও আরবি ভাষা শেখানোর বিষয়টি এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিদেশগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু যে দেশের কর্মপরিবেশে তাঁদের কাজ করতে হবে, সেই দেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠান। এই অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান, পারিবারিক ব্যয় নির্বাহ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যগামী কর্মীদের ভাষাগত দক্ষতা বাড়ানো হলে তাঁরা কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন। একই সঙ্গে কাজের নির্দেশনা বোঝা, কর্মসংক্রান্ত সমস্যা তুলে ধরা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করাও সহজ হতে পারে।
তাই আরবি ভাষা শেখানোর বিষয়টিকে শুধু অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ হিসেবে না দেখে বিদেশগামী কর্মীদের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিদেশে কর্মরত একজন শ্রমিকের জন্য স্থানীয় ভাষায় যোগাযোগ করতে পারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা জানা থাকলে তিনি নিয়োগকর্তার নির্দেশনা বুঝতে পারবেন, কর্মক্ষেত্রে নিজের সমস্যার কথা জানাতে পারবেন এবং চুক্তি বা বেতনসংক্রান্ত বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারবেন।
অন্যদিকে, ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক কর্মী প্রয়োজনীয় তথ্য বুঝতে অসুবিধায় পড়তে পারেন। এতে তাঁদের অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ে এবং প্রতারণা, মজুরি নিয়ে বিরোধ কিংবা কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তবে শুধু ভাষা জানলেই সব সমস্যা দূর হবে না। কর্মীদের শ্রম অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা, চুক্তি বোঝার সক্ষমতা এবং বিদেশে সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।
মধ্যপ্রাচ্যগামী কর্মীদের জন্য প্রাক্-বহির্গমন ওরিয়েন্টেশন বা পিডিও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে স্বল্প সময়ের এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটি ভাষার কার্যকর দক্ষতা অর্জন করা কঠিন।
এ কারণে কর্মীদের জন্য আলাদা ও পর্যাপ্ত সময়ের আরবি ভাষা কোর্স চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। দৈনন্দিন কথোপকথন, কর্মক্ষেত্রের নির্দেশনা বোঝা, জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য জানার মতো বিষয়গুলো এসব কোর্সে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
পেশাভেদে ভাষা প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা হলে কর্মীরা আরও বেশি উপকৃত হতে পারেন। যেমন, নির্মাণশ্রমিক, গাড়িচালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও সেবাখাতে নিয়োজিত কর্মীদের ভাষাগত প্রয়োজন এক রকম নয়।
কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোতে আরবি ভাষা শেখানোর উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেটিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। প্রশিক্ষকদের দায়িত্ব, কর্মপরিধি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা স্পষ্ট না থাকলে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতে পারে।
আরবি ভাষা প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো তৈরি করা হলে সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। প্রশিক্ষকদের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা এবং কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এ ক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।
বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে দক্ষতা বলতে সাধারণত কারিগরি কাজের সক্ষমতাকে বোঝানো হয়। কিন্তু একজন কর্মী কাজ জানার পাশাপাশি নির্দেশনা বুঝতে, সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে এবং নিজের সমস্যার কথা তুলে ধরতে পারছেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশের শ্রমবাজারে ভাষা শেখার গুরুত্ব থেকে বাংলাদেশও শিক্ষা নিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের জন্যও একই ধরনের পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন, যদিও দেশ ও পেশাভেদে ভাষাগত চাহিদা ভিন্ন হতে পারে।
মৌলিক আরবি ভাষা প্রশিক্ষণ চালু করা গেলে কর্মীদের কর্মপরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া সহজ হতে পারে। পাশাপাশি উন্নত দক্ষতার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতেও ভাষাগত সক্ষমতা সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যগামী কর্মীদের জন্য এক থেকে তিন মাস মেয়াদি মৌলিক আরবি ভাষা কোর্স চালুর প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। কর্মীর পেশা ও গন্তব্য দেশের চাহিদা অনুযায়ী কোর্সের সময়সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের ভাষাগত দক্ষতা মূল্যায়নের ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে।
একই সঙ্গে প্রশিক্ষকদের দায়িত্ব ও কর্মসংস্থানের কাঠামো স্পষ্ট করা, প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিদেশগামী কর্মীদের ভাষা শেখার সুযোগ সহজলভ্য করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী কর্মীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের শুধু বিদেশে পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং দক্ষতা, নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার হওয়ায় আরবি ভাষা প্রশিক্ষণকে বিদেশগামী কর্মীদের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া সময়ের দাবি। পরিকল্পিত ভাষা শিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা এবং শ্রম অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত করা গেলে কর্মীরা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যবস্থাও আরও কার্যকর হতে পারে।