রবিবার, অক্টোবর ৪, ২০২৬
১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

সদ্যপ্রাপ্ত

>> ডাববোঝাই নছিমন অতিক্রম করতে গিয়ে সংঘর্ষ, প্রাণ গেল তিন মোটরসাইকেল আরোহীর

>> একাধিক দেশের নেতার সঙ্গে ট্রাম্পের ছবি প্রায় একই রকম কেন?

>> চট্টগ্রাম বন্দরের ৯ কনটেইনারে বিপজ্জনক রাসায়নিক, ধ্বংস হবে রূপগঞ্জে

>> গাজীপুরে সোয়েটার কারখানায় আগুন, নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ৯ ইউনিট

>> শেখ হাসিনাকে ফেরানোর আইনি প্রক্রিয়া চলছে: দীনেশ ত্রিবেদী

>> আখতারুজ্জামানের গ্রেপ্তার নিয়ে কটিয়াদীতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া, মুক্তির দাবিতে জামায়াতের বিক্ষোভ

>> ‘আমি আওয়ামী লীগার না’ বলে আদালত চত্বরে হেলমেট ছুড়ে ফেললেন আখতারুজ্জামান

>> দেশে আবার দুর্নীতি বেড়েছে, সীমান্তে পাহারা বসানোর দাবি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর

>> বাসের টিকিট বিক্রি নিয়ে বিরোধ, দুই পক্ষের সংঘর্ষ ও ককটেল বিস্ফোরণ, আহত ১০

>> ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে ১০ অক্টোবর দিল্লিতে বিক্ষোভের ডাক

আপনি পড়ছেন : রাজনীতি

রাজনৈতিক সংকটটা আমাদের নিজেদের মধ্যে


৪ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১০:৩৬
রাজনৈতিক সংকটটা আমাদের নিজেদের মধ্যে

সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম (সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক):

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সচেতন নাগরিকদের একটি বড় অংশই বর্তমান দলীয় রাজনীতি এবং এর পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে একই ধরণের উদ্বেগ প্রকাশ করে থাকেন। রাজনীতির ভেতরে যে "গলদ" বা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো ঢুকে গেছে, 

দলগুলোর ভেতরে নীতি নির্ধারণ বা নেতৃত্ব নির্বাচনে তৃণমূলের কর্মীদের মতামত অনেক সময় উপেক্ষিত হয়। শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হওয়ার কারণে দলে একনায়কতান্ত্রিক প্রবণতা তৈরি হয়।আমাদের রাজনৈতিক সংকট মূলত পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা, আস্থার অভাব এবং নিজেদের মধ্যকার সংকীর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির ফল

আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ, এই খেটে খাওয়া কর্মী-জনতা, তারা কিন্তু অত্যন্ত ভালো জায়গায় আছে। তারা আমাদের চায়। জনগণের জায়গায় কোনো চ্যুতি নেই, কোনো ঘাটতি নেই। মানুষের আকাঙ্ক্ষায় কোনো সংকট নেই। সংকটটা আমাদের নিজেদের মধ্যে।
আমাদের রাজনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে, দল পরিচালনার প্রতিটি স্তরে মারাত্মক গলদ ঢুকে গেছে। আর সেই গলদের সবচেয়ে বড় জায়গাটা হলো সাংগঠনিক বিচ্ছিন্নতা।
আমাদের নেতারা কেউ কারও সঙ্গে কার্যকর ভাবে সংযুক্ত নন। একজন নেতার সঙ্গে আরেকজন নেতার নিয়মিত যোগাযোগ নেই। মাঠের কর্মীর সঙ্গে তার নেতৃত্বের যোগাযোগ নেই। একটি ইউনিটের সঙ্গে অন্য ইউনিটের সমন্বয় নেই। অথচ সবাই কোনো না কোনো উর্ধ্বতন মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
আর আমি এখানে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কথা বলছি না। আমি বলছি সেই আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ের গডফাদার গোছের নেতৃত্বের কথা, যাদের চারপাশে ব্যক্তিগত বলয় তৈরি হয়েছে এবং অনেকেই দলীয় কাঠামোর চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্যকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে ফেলেছেন। সবাই যেন রাজনীতি করতে এসেছে মাইম্যান হওয়ার জন্য।
কে কার লোক, কে কোন নেতার লোক, কার সঙ্গে কার ঘনিষ্ঠতা, কার কাছে কার সরাসরি যাতায়াত আছে, কার মাধ্যমে কার কাছে পৌঁছানো যায়, এই হিসাবটাই যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন বলছে, ‘আমি অমুক নেতার লোক।’ আরেকজন বলছে, ‘আমি তমুক ভাইয়ের লোক।’ কিন্তু তারা একটা মৌলিক কথাই ভুলে যাচ্ছে। তারা কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত কর্মচারী নয়। তারা একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী।
একটি দলে একজন সুপ্রিম লিডার থাকতে পারেন, সর্বোচ্চ নেতৃত্বে একজন থাকতে পারেন। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, দলের আর কোনো নেতা নেই, কোনো সাংগঠনিক কাঠামো নেই, কোনো মধ্যবর্তী নেতৃত্ব নেই, কোনো দায়িত্বশীল কমিটি নেই। সুপ্রিম লিডারের প্রতি আনুগত্য আর দলের অন্যান্য নেতৃত্বকে অস্বীকার করা এক জিনিস নয়। বরং একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠনে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের প্রতি আস্থার পাশাপাশি দলের প্রতিটি স্তরের নেতৃত্বের প্রতি সাংগঠনিক সম্মান, দায়িত্বের স্বীকৃতি, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সমন্বয় থাকতে হয়।
কিন্তু আমরা কী করছি?
আমরা দলের কাঠামোর ভেতরে সমন্বিত নেতৃত্ব গড়ে তোলার পরিবর্তে ব্যক্তি কেন্দ্রিক বলয় তৈরি করছি। একজন নেতা আরেকজন নেতাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইছেন। একজন কর্মী আরেকজন কর্মীকে সহযোদ্ধা হিসেবে দেখছেন না, দেখছেন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। সবাই নিজের নিজের নেতার ছায়ার নিচে জায়গা করে নিতে ব্যস্ত। ফলে একই দলের ভেতরে তৈরি হচ্ছে একাধিক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। এভাবে কি কোনো রাজনৈতিক দল চলতে পারে?
একটি কমিটিতে সভাপতি আছেন, সাধারণ সম্পাদক আছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাদের সঙ্গে মাঠের কর্মীদের সম্পর্কটা কী? কর্মী কি জানেন দলের আগামী দিনের পরিকল্পনা কী? নেতৃত্ব কি জানেন মাঠের কর্মীর বাস্তব সমস্যা কী? ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, থানা কিংবা উপজেলা পর্যায়ের সংগঠনের সঙ্গে ওপরের স্তরের নিয়মিত যোগাযোগ কোথায়? কোথায় সমন্বিত পরিকল্পনা? কোথায় পলিসি মেকিং? কোথায় কর্মীদের মতামত গ্রহণের ব্যবস্থা?
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কমিউনিকেশন গ্যাপ। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বোঝাপড়ার অভাব, সমন্বয়ের অভাব এবং পারস্পরিক আস্থার সংকট। একদিকে সভাপতি, অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক, আর মাঝখানে মাঠের কর্মীরা যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো পড়ে আছেন। এটা সংগঠন নয়। এটা সাংগঠনিক বিচ্ছিন্নতা।
মনে রাখতে হবে, শুধু কমিটি ঘোষণা করলেই সংগঠন হয় না। শুধু ওপর থেকে নির্দেশ দিলেই সংগঠন দাঁড়িয়ে যায় না। শুধু কয়েকজন নেতাকে সামনে রেখে ছবি তুললেই রাজনৈতিক শক্তি তৈরি হয় না। রাজনৈতিক দল তৈরি হয় নেতা ও কর্মীর পারস্পরিক বিশ্বাসে, নিয়মিত যোগাযোগে, সাংগঠনিক শৃঙ্খলায়, সমন্বিত পরিকল্পনায় এবং মাঠের মানুষের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন সম্পর্কের মধ্য দিয়ে।
আপনারা যতই নিজেদের বোঝান, ‘এই হচ্ছে, ওই হচ্ছে’, যতই আত্মপ্রসাদ লাভ করুন, বাস্তবতা কিন্তু অন্য কথা বলছে।
যতদিন নিজেদের ভেতরের এই ভাঙন রোধ করতে পারবেন না, যতদিন ব্যক্তি নির্ভর বলয়ের পরিবর্তে সাংগঠনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে পারবেন না, যতদিন একজন নেতার সঙ্গে আরেকজন নেতার, একজন কর্মীর সঙ্গে তার নেতৃত্বের এবং একটি ইউনিটের সঙ্গে অন্য ইউনিটের কার্যকর যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না, ততদিন কিছুই হবে না। কিছুই নড়বে না।
কারণ রাজনীতি শুধু আবেগ দিয়ে হয় না। রাজনীতি শুধু জনপ্রিয়তা দিয়ে হয় না। রাজনীতি করতে হলে সংগঠন লাগে। শৃঙ্খলা লাগে। পরিকল্পনা লাগে। সমন্বয় লাগে। আর সবচেয়ে বেশি লাগে নিজেদের মধ্যে আস্থা ও যোগাযোগ।
আর একটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার।
আজকে জনগণের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, যে রাজনৈতিক অপেক্ষা তৈরি হয়েছে, সেটাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। সাধারণ মানুষ অনেক কিছুই বোঝে। তারা রাজনীতির গতিপথও পর্যবেক্ষণ করে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, জনগণের একটি অংশ যেখানে অপেক্ষা করছে, সেখানে আমাদের দলের অনেক নেতাকর্মী এখনো দলছুট হয়ে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। জনগণ প্রস্তুত, অথচ সংগঠন অপ্রস্তুত। এটা চলতে পারে না।
প্রত্যাবর্তনের কথা যদি বলেন, তাহলে তার আগে সংগঠনকে ফিরিয়ে আনতে হবে। কর্মীদের ফিরিয়ে আনতে হবে। এক নেতার সঙ্গে আরেক নেতার যোগাযোগ ফিরিয়ে আনতে হবে। মাঠের সঙ্গে নেতৃত্বের যোগাযোগ ফিরিয়ে আনতে হবে। ব্যক্তির প্রতি অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে দলের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
‘আমি কার লোক’ এই প্রশ্নের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রশ্ন করতে হবে, ‘আমি দলের জন্য কী করছি?’ কারণ একজন নেতার লোক দিয়ে একটি বলয় তৈরি করা যায়, কিন্তু একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করা যায় না। একজনের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগত পরিচয় বানানো যায়, কিন্তু একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ভার বহন করার মতো সাংগঠনিক শক্তি তৈরি করা যায় না।
একটি রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বড় সম্পদ কোনো একক নেতার চারপাশে জড়ো হওয়া মাইম্যান নয়। সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো শৃঙ্খলাবদ্ধ, সচেতন, পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত এবং দলের প্রতি দায়বদ্ধ কর্মীবাহিনী। তাই এখন আত্মপ্রসাদের সময় নয়। এখন আয়নার সামনে দাঁড়ানোর সময়। কোথায় ভাঙন, কোথায় বিচ্ছিন্নতা, কোথায় যোগাযোগের ঘাটতি, কোথায় নেতৃত্বের ব্যর্থতা, কোথায় কর্মীর ক্ষোভ, কোথায় সাংগঠনিক দুর্বলতা, কোথায় ব্যক্তিনির্ভর বলয়, সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে। কারণ জনগণ যখন প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করে, তখন সংগঠনের অপ্রস্তুতি শুধু দুর্বলতা নয়, এটি একটি গুরুতর সাংগঠনিক সংকেত।
প্রত্যাবর্তনের দরজা যদি খুলতেই হয়, তাহলে আগে ঘর গোছাতে হবে। জনগণকে সঙ্গে পাওয়া বড় শক্তি। কিন্তু সেই জনগণের প্রত্যাশাকে ধারণ করার মতো একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল তৈরি করা তার চেয়েও বড় দায়িত্ব। সুতরাং এখন আর প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, ‘কে কার লোক?’ প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘কে দলের লোক?’ আর সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে ব্যক্তির বলয় ভেঙে সংগঠনের ভেতরকার যোগাযোগ, সমন্বয়, শৃঙ্খলা এবং ঐক্যকে ফিরিয়ে আনতেই হবে ।
[
[