সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের একটি বড় এলাকায় দ্রুত বদলে যাচ্ছে বনের প্রধান গাছের বিন্যাস। একসময় যেখানে সুন্দরী ও গেওয়াগাছের আধিপত্য ছিল, সেখানে এখন বাড়ছে কাঁকড়াগাছের বিস্তার। গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯৮৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সুন্দরী–গেওয়াপ্রধান বনভূমি প্রায় ৫ হাজার হেক্টর কমেছে। একই সময়ে কাঁকড়াগাছপ্রধান এলাকার আয়তন বেড়েছে আট গুণের বেশি।
চাঁদপাই রেঞ্জের প্রায় ২৭২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ১৯৮৮ ও ২০২২ সালের উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে এই পরিবর্তন শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। গবেষণাটি ‘ডিটেকশন অব কাঁকড়া ট্রি এক্সপ্যানশন ইন দ্য নর্দান সুন্দরবনস’ নামে আন্তর্জাতিক সাময়িকী সায়েন্টিফিক রিপোর্টসে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠানের (স্পারসো) এম মাহমুদুর রহমান। তাঁর সঙ্গে স্পারসো, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জার্মানির ড্রেসডেন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষকেরা কাজ করেছেন।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, ১৯৮৮ সালে গবেষণা এলাকায় প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে সুন্দরী ও গেওয়াগাছের আধিপত্য ছিল। ২০২২ সালে সেই আয়তন কমে প্রায় ১২ হাজার হেক্টরে দাঁড়ায়। অর্থাৎ ৩৪ বছরে কমেছে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর।
অন্যদিকে কাঁকড়াগাছপ্রধান বনভূমি ১৯৮৮ সালে ছিল প্রায় ৬৬০ হেক্টর। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪৩৪ হেক্টরে। এর মধ্যে ঘন কাঁকড়াগাছপ্রধান এলাকার আয়তন প্রায় ১৭ গুণ বেড়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সুন্দরী–গেওয়াপ্রধান প্রায় ৪ হাজার ৮০০ হেক্টর এলাকা সরাসরি কাঁকড়াগাছপ্রধান বনে পরিণত হয়েছে। গবেষণা এলাকার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি অংশে প্রধান গাছের ধরন বা ভূমির আচ্ছাদনে পরিবর্তন এসেছে।
কেন বাড়ছে কাঁকড়াগাছ
গবেষকেরা বলছেন, এই পরিবর্তনের পেছনে একাধিক পরিবেশগত কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জোয়ারের ধরন পরিবর্তন, পলি জমা, ভূমিক্ষয় এবং সুন্দরীগাছের আগামরা রোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে গবেষণাটি সরাসরি কোনো একটি কারণকে কাঁকড়াগাছের বিস্তারের জন্য দায়ী করেনি। কারণ গবেষণা এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি লবণাক্ততা, জোয়ারের উচ্চতা ও ভূগর্ভস্থ পানির পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সুন্দরী তুলনামূলক কম লবণাক্ত পরিবেশ ও পলিমাটিতে ভালো জন্মে। অন্যদিকে কাঁকড়াগাছ বেশি লবণাক্ত পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে। ফলে মিঠাপানির প্রবাহ কমে লবণাক্ততা বাড়লে কাঁকড়াগাছের জন্য পরিবেশ তুলনামূলকভাবে অনুকূল হয়ে উঠতে পারে।
গবেষকেরা ১৯৮৮ ও ২০২২ সালের একই ঋতুতে তোলা ল্যান্ডস্যাট উপগ্রহের ছবি বিশ্লেষণ করেছেন। গাছের পাতায় আলোর প্রতিফলনের পার্থক্য ব্যবহার করে প্রধান গাছের ধরন শনাক্ত করা হয়। পাশাপাশি পুরোনো বন জরিপের মানচিত্র, আগের গবেষণার তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে ফলাফল মিলিয়ে দেখা হয়েছে।
২০২২ সালের নভেম্বরে সুন্দরবনে গিয়ে ১২টি নমুনা এলাকায় গাছের ধরন ও অবস্থান যাচাই করেন গবেষকেরা। তাঁদের তৈরি মানচিত্রের নির্ভুলতা ৯০ শতাংশের বেশি পাওয়া গেছে।
সুন্দরবনের জন্য কী অর্থ বহন করছে
গবেষকদের মতে, কাঁকড়াগাছ যেখানে প্রাধান্য পায়, সেখানে অন্যান্য প্রজাতির উপস্থিতি তুলনামূলক কম হতে পারে। ফলে সুন্দরী ও গেওয়ার জায়গায় কাঁকড়াগাছের বিস্তার বনের প্রাকৃতিক গঠন ও জীববৈচিত্র্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।
সুন্দরবনের গাছের বিন্যাস বদলে গেলে এর প্রভাব পড়তে পারে গাছের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম, প্রাণীদের আবাসস্থল এবং সামগ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর।
গবেষকেরা অবশ্য এটিও উল্লেখ করেছেন যে, বাইরে থেকে সুন্দরবন সবুজ ও অক্ষত মনে হলেও দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে বনের ভেতরে প্রধান গাছের প্রজাতিগত বিন্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে।
সব মিলিয়ে গবেষণাটি সুন্দরবনের পরিবেশগত পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে। সুন্দরী–গেওয়ার বনভূমি কমে কাঁকড়াগাছের বিস্তার বাড়ার এই প্রবণতা ভবিষ্যতে কীভাবে বদলায়, তা পর্যবেক্ষণ করা এবং লবণাক্ততা ও মিঠাপানির প্রবাহের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন নিয়ে আরও গবেষণা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা।