যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দুই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সি চিন পিংয়ের সাম্প্রতিক বৈঠক ঘিরে প্রত্যাশা খুব বেশি ছিল না। তবে বৈঠকের পর দুই দেশের সম্পর্কের বড় কোনো অগ্রগতি না আসায় প্রশ্ন উঠেছে—এই বৈঠন থেকে আসলে কে বেশি সুবিধা পেল?
সি চিন পিং এবার যুক্তরাষ্ট্র সফরে এসে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন। জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। দুই নেতা প্রায় ৯০ মিনিট আলোচনা করেন। বৈঠকে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তাইওয়ান, ইরান ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয়।
বৈঠকের পর ট্রাম্প এটিকে ভালো বৈঠক হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে আলোচনায় বড় কোনো চুক্তি বা গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতার ঘোষণা আসেনি। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফলাফল হিসেবে সামনে এসেছে দুই দেশের বাণিজ্যসংক্রান্ত আগের সমঝোতার মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়ানোর বিষয়টি। পাশাপাশি চীন থেকে দুটি জায়ান্ট পান্ডা যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা চিড়িয়াখানায় পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বাণিজ্য। ট্রাম্প প্রশাসন চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে চীনও বিরল খনিজসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু পণ্যের রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে।
দুই দেশের বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব শুধু ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিশ্বের দুই বড় অর্থনীতির মধ্যে শুল্ক ও পাল্টা শুল্কের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ও অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হয়েছে।
চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমলেও বিশ্লেষকদের মতে, তৃতীয় দেশ হয়ে চীনা পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করার কারণে প্রকৃত চিত্র কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। একই সময়ে চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্য উদ্বৃত্তও বেড়েছে।
বাণিজ্য ইস্যুতে সামান্য অগ্রগতি হলেও তাইওয়ানসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই দেশের অবস্থানের পার্থক্য রয়ে গেছে। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে মনে করে এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সম্পর্ক বজায় রেখে আসছে।
বৈঠকে সি চিন পিং তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে অবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বলে চীনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে ট্রাম্প এ বিষয়ে চীনের প্রত্যাশা মেনে কোনো নতুন অবস্থান নিয়েছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বড় অস্ত্র বিক্রির বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। চীন দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিরোধিতা করে আসছে।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মানবাধিকার নিয়েও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এসব বিষয়ে বৈঠক থেকে বড় কোনো সমঝোতার ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, বড় কোনো ছাড় না দিয়েও ওয়াশিংটনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পাওয়া এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যসংক্রান্ত উত্তেজনা সাময়িকভাবে কমানো চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আবার অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও চীনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা চালু রাখা এবং বাণিজ্যযুদ্ধ আরও তীব্র না করা গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে বৈঠকটিকে শুধু কে জিতল বা কে হারল—এভাবে দেখার বদলে এটিকে দুই পরাশক্তির মধ্যে চলমান প্রতিযোগিতা ও সমঝোতার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাণিজ্য, তাইওয়ান, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে দুই দেশের মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে।