সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিআরটিএর প্রচলিত বিধি অনুযায়ী লার্নার লাইসেন্স গ্রহণের পর নির্ধারিত দিনে আবেদনকারীকে বায়োমেট্রিক, লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। এসব ধাপে উত্তীর্ণ হওয়ার পরই ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বরিশাল বিআরটিএ কার্যালয়ে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া অনেক প্রার্থীও অর্থের বিনিময়ে উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে সৌরভ সাহার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি দালাল চক্র কাজ করছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
এ বিষয়ে একটি লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্সের নথিতে (লার্নার নম্বর: ১১-১৮৫৯৮২০১, আবেদনকারী: আকাশ খান, পিতা: মনির খান) উল্লেখ রয়েছে, আবেদনকারীর পরীক্ষার তারিখ নির্ধারিত ছিল ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬। অভিযোগকারীদের দাবি, পরীক্ষার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ও ফলাফল যাচাইয়ের নিয়ম উপেক্ষা করে অর্থের বিনিময়ে কিছু আবেদনকারীকে উত্তীর্ণ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। এমনকি পরীক্ষা বোর্ডে ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে ফলাফল ও পরীক্ষার খাতায় অনিয়ম করার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই কার্যক্রম পরিচালনায় বিআরটিএ কার্যালয়ের আশপাশে সক্রিয় রয়েছে একটি দালাল ও ড্রাইভার চক্র। সৌরভ সাহার ব্যক্তিগত চালক হিসেবে পরিচিত রিয়াজ খান ছাড়াও আলাউদ্দীন, জাকির, আসাদুল ও হৃদয়সহ প্রায় ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলে দাবি করা হয়েছে। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার আশঙ্কায় থাকা প্রার্থীদের সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার চুক্তি করার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি পরীক্ষার বোর্ডকে কেন্দ্র করে অবৈধ লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা। এই অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে পৌঁছায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ড্রাইভিং লাইসেন্সের পাশাপাশি যানবাহন নিবন্ধন কার্যক্রমেও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে সৌরভ সাহার বিরুদ্ধে। বিশেষ করে সিএনজি অটোরিকশার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে প্রতিটি গাড়ির বিপরীতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আরও অভিযোগ, যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই শত শত থ্রি-হুইলার ও সিএনজি নিবন্ধনের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এর আগেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সৌরভ সাহার বিরুদ্ধে মামলা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরে তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা পড়ার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে, চাকরিতে যোগদানের পর গত প্রায় ১১ বছরে সৌরভ সাহা ও তার পরিবারের নামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে তার। এর মধ্যে একাধিক বাস, বিলাসবহুল ব্যক্তিগত গাড়ি এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সম্পদের কথাও বলা হচ্ছে। ‘হাওলাদার পরিবহন’-এর বাসও তার সম্পদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, উৎস ও আর্থিক বৈধতা সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু সরকারি সেবার স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং সড়ক নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগজনক। যথাযথ দক্ষতা ও পরীক্ষা ছাড়াই চালকের লাইসেন্স দেওয়া হলে সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ অবস্থায় সৌরভ কুমার সাহার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, তার ও পরিবারের নামে থাকা সম্পদের উৎস অনুসন্ধান, লাইসেন্স পরীক্ষার ফলাফল এবং যানবাহন নিবন্ধনের নথি যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। একই সঙ্গে দুদক, বিআরটিএর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রমাণের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।