বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জটিলতা চলছে। বছরের পর বছর একই পদে দায়িত্ব পালন করেও অনেক প্রভাষক পরবর্তী পদে যেতে পারছেন না। এতে তাঁদের পেশাগত স্বীকৃতি, কর্মপ্রেরণা ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক উদ্যোগে পদোন্নতির বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। ২৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সরকারি কলেজ-১ শাখা থেকে দুটি পৃথক স্মারক জারি করা হয়। এর মাধ্যমে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাষকদের সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সভা এবং কর্মকর্তাদের উচ্চতর গ্রেড, বিশেষ করে চতুর্থ গ্রেডে উন্নীত করার বিষয়ে সভা আহ্বান করা হয়। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ২৭ জুলাই এসব বিষয়ে সভা হওয়ার কথা ছিল।
এর আগে ২০ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সরকারি কলেজে কর্মরত ১০ম গ্রেডের ১৪৫ জন বিষয়ভিত্তিক প্রদর্শককে ৯ম গ্রেডের প্রভাষক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তাঁদের দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পদায়নও করা হয়। এই সিদ্ধান্তের পর শিক্ষা ক্যাডারের দীর্ঘদিনের পদোন্নতি জট আবারও আলোচনায় এসেছে।
কেন দীর্ঘদিন আটকে পদোন্নতি?
শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে শূন্য পদ, পদসংকট ও প্রশাসনিক জটিলতার কথা বলা হয়েছে। কখনো আর্থিক সংশ্লেষের বিষয়টিও সামনে এসেছে। তবে পদোন্নতি আটকে থাকার সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
বিশেষ করে পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধিকে একই বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কোনো কর্মকর্তাকে উচ্চতর পদমর্যাদা দেওয়া হলেও সব ক্ষেত্রে এর সঙ্গে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা যুক্ত নাও হতে পারে। ফলে আর্থিক সংশ্লেষ না থাকলে শুধু অর্থের কারণ দেখিয়ে পদোন্নতি দীর্ঘদিন আটকে রাখা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
অন্য ক্যাডারের সঙ্গে বৈষম্যের অভিযোগ
শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বড় একটি অভিযোগ হলো, একই সময়ে নিয়োগ পাওয়া অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিয়মিত পদোন্নতির মাধ্যমে উচ্চতর পদে পৌঁছালেও শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বড় অংশ দীর্ঘদিন একই পদে রয়ে গেছেন।
বিশেষ করে ৩৬তম ব্যাচের শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা প্রায় এক যুগের চাকরিজীবন পার করেও কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি না পাওয়ায় হতাশ। একই ব্যাচের অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা এরই মধ্যে উচ্চতর গ্রেডে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষা ক্যাডারের ৩৭তম ও ৩৮তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বঞ্চনার অভিযোগ রয়েছে।
দীর্ঘদিন পদোন্নতি না হওয়ায় জ্যেষ্ঠতা, দায়িত্ব বণ্টন ও পেশাগত অগ্রগতির স্বাভাবিক কাঠামোও ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আর্থিক সংশ্লেষ ছাড়াই পদোন্নতির নজির
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আর্থিক সংশ্লেষ ছাড়াই ৯২২ জন সহযোগী অধ্যাপককে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এই উদ্যোগ দেখিয়েছে, প্রয়োজন হলে শূন্য পদ বা আর্থিক সীমাবদ্ধতার বাইরে গিয়েও প্রশাসনিকভাবে পদোন্নতির জট নিরসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব।
এ কারণে শিক্ষা ক্যাডারের নিচের স্তরের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি উঠেছে।
সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির দাবি
দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি জট কমাতে সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির কথাও আলোচনায় রয়েছে। শূন্য পদকে পদোন্নতির প্রধান বাধা হিসেবে বিবেচনা করা হলে এই ব্যবস্থা কার্যকর সমাধান হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া বিধি অনুযায়ী যাঁরা উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্য, তাঁদের বিষয়টিও দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি রয়েছে।
শুধু সভা নয়, প্রয়োজন কার্যকর সিদ্ধান্ত
শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মতে, পদোন্নতি কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও চাকরির স্বাভাবিক কাঠামোর অংশ। তাই বছরের পর বছর একই পদে আটকে না রেখে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পদোন্নতি প্রক্রিয়া শেষ করার ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সরকারি কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা, পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁদের পেশাগত অগ্রগতি অনিশ্চিত হলে কর্মপরিবেশ ও কর্মপ্রেরণাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তাই সংশ্লিষ্টদের দাবি, পদোন্নতির ক্ষেত্রে যেসব প্রশাসনিক বা আইনগত বাধা রয়েছে, সেগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান করা হোক। শূন্য পদ সমস্যা হলে সুপারনিউমারারি পদের ব্যবস্থা, আর্থিক সংশ্লেষ না থাকলে দ্রুত পদোন্নতি এবং যোগ্য কর্মকর্তাদের উচ্চতর গ্রেডের বিষয়টি নিষ্পত্তি করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষকদের মর্যাদা নিশ্চিত করতে শুধু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নয়, তাঁদের পেশাগত উন্নয়ন ও ন্যায্য সুযোগও নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, একটি মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জন্য স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও পূর্বানুমেয় ক্যারিয়ার কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ।