ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথে একসময় ছয়টি লোকাল ও মেইল ট্রেন চলাচল করত। কম ভাড়ায় এসব ট্রেনে দূরের বাজার, কর্মস্থল কিংবা বাড়িতে যাতায়াত করতেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু করোনাকালে এই পথে চারটি লোকাল ও একটি মেইল ট্রেন বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ ময়মনসিংহ মেইল, স্থানীয়ভাবে ‘নাসিরাবাদ মেইল’ নামে পরিচিত, সেটিও গত সোমবার থেকে বন্ধ রয়েছে।
ভৈরব থেকে ময়মনসিংহের দূরত্ব ১১৬ কিলোমিটার। এই পথে লোকাল ট্রেনের ভাড়া ছিল ৪০ টাকা এবং মেইল ট্রেনে ৫৫ টাকা। এখন লোকাল ও মেইল ট্রেন না থাকায় যাত্রীদের আন্তনগর ট্রেনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আন্তনগর ট্রেনে এই পথে ভাড়া ১২৭ টাকা পর্যন্ত। আবার এসব ট্রেন সব স্টেশনে থামে না।
রেলওয়ে বলছে, লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিনের তীব্র সংকটের কারণে নাসিরাবাদ ট্রেনটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে কবে নাগাদ এটি আবার চালু হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
ইব্রাহিমাবাদ থেকে ভৈরব পর্যন্ত পথে নাসিরাবাদ ট্রেনটি ২৭টি স্টেশনে থামত। এসব ছোট স্টেশনের অনেকগুলোতে আন্তনগর ট্রেন থামে না। ফলে ট্রেনটি বন্ধ হওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন এসব এলাকার যাত্রীরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রধান ভরসা ছিল কম ভাড়ার লোকাল ও মেইল ট্রেন। ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও জামালপুরের মানুষের জন্য এই রেলপথ ছিল গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের মাধ্যম।
এই অঞ্চলের কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ধান, দুধ, ডিম, কলা, মুরগি, ফল, শাকসবজি, কাপড়, জুতা ও অন্যান্য পণ্য এক বাজার থেকে অন্য বাজারে নিতে ট্রেন ব্যবহার করতেন। ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের পরিবহন খরচও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
বৃহত্তর ময়মনসিংহের অনেক মানুষ ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তাঁদের অনেকে বাড়ি ও কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য নাসিরাবাদ ট্রেন ব্যবহার করতেন।
কৃষিশ্রমিক আজিজুর রহমান জানান, আগে কুমিল্লা থেকে পূর্বধলা পর্যন্ত ট্রেনে যাতায়াতে তাঁর খরচ হতো প্রায় ১০০ টাকা। ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন যানবাহন বদলে ভৈরব পর্যন্ত আসতেই তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ২৭০ টাকা। এরপর কুমিল্লা যেতে আরও টাকা খরচ করতে হবে।
আরেক শ্রমিক আইজউদ্দিন বলেন, আগে এক মাস বা দেড় মাস পরপর বাড়িতে যেতেন। নাসিরাবাদ ট্রেন বন্ধ হওয়ায় এখন তিন মাসের আগে বাড়ি যাওয়া সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশ রেলওয়ের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (পূর্ব) মোহাম্মদ সফিকুর রহমান জানিয়েছেন, মূলত লোকোমোটিভ সংকটের কারণে নাসিরাবাদ ট্রেনটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। ইঞ্জিনের সংকট কমলে ট্রেনটি আবার চালু করা হবে।
মালামাল পরিবহনের সমস্যা কিছুটা কমাতে বিজয় এক্সপ্রেসের সঙ্গে আপাতত একটি লাগেজ বগি যুক্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে নাসিরাবাদ ট্রেন ঠিক কবে চালু হবে, সে বিষয়ে তাঁর উত্তর—‘অপেক্ষা করতে হবে।’
কম ভাড়ার লোকাল ও মেইল ট্রেনগুলো দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর সর্বশেষ নাসিরাবাদ মেইলও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথের সাধারণ ও নিম্ন আয়ের যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।