গাড়ির ফিটনেস সনদ, নতুন নিবন্ধন, ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বর যাচাই কিংবা যানবাহনের বডি পরিবর্তনের অনুমোদন—এসব সেবা নির্ধারিত সরকারি নিয়মে পাওয়ার কথা। তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো-৪ সার্কেল কার্যালয়কে ঘিরে ঘুষ লেনদেন, মধ্যস্থতাকারীদের তৎপরতা এবং নিয়মবহির্ভূত সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
কার্যালয়টির সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ আলী আহসান মিলনের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছেন কয়েকজন পরিবহন মালিক ও চালক। তাঁদের দাবি, সরকারি ফি পরিশোধের পরও বিভিন্ন সেবা পেতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে কিছু কাজ দ্রুত সম্পন্ন হলেও নিয়মিত প্রক্রিয়ায় আবেদনকারীদের দীর্ঘসূত্রতা ও ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য নথি ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য পাওয়া না যাওয়ায় অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
বেরাইদ এলাকার মাইক্রোবাস মালিক সুজন আহমেদের অভিযোগ, সরকারি ফি জমা দেওয়ার পরও ফিটনেস সনদ সংগ্রহ করতে তাঁকে প্রায় তিন সপ্তাহ বিআরটিএ কার্যালয়ে যাতায়াত করতে হয়েছে। পরে কার্যালয়ের বাইরে এক ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করার মাধ্যমে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার প্রস্তাব দেন বলে দাবি করেন তিনি।
সুজন আহমেদের ভাষ্য, “সরকারি ফি জমা দিয়েও তিন সপ্তাহ ঘুরেছি। পরে অফিসের বাইরে এক দালাল এসে বলে—‘স্যারকে ম্যানেজ’ করলে একদিনেই হয়ে যাবে। টাকা দেওয়ার পরদিনই ফিটনেস সনদ হাতে পাই।”
তাঁর দাবি অনুযায়ী, অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার পরপরই সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এ বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা গেলে আবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্বের কারণ এবং অর্থ লেনদেনের সঙ্গে সেবার গতির কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা স্পষ্ট হতে পারে।
অভিযোগকারী পরিবহন মালিক ও চালকদের দাবি, ঢাকা মেট্রো-৪ সার্কেল কার্যালয়ের ভেতরে ও বাইরে কয়েকজন মধ্যস্থতাকারী সক্রিয় রয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে এসব ব্যক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ করলে আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। অন্যদিকে সরাসরি নিয়ম অনুসরণ করে আবেদন করলে ফাইল আটকে থাকা, অযৌক্তিক ত্রুটি দেখানো কিংবা পুনঃপরিদর্শনের নামে ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গাড়ির ফিটনেস নবায়ন, নতুন রেজিস্ট্রেশন, ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বর যাচাই এবং বডি পরিবর্তনের অনুমোদনসংক্রান্ত কাজে অতিরিক্ত অর্থ দাবির অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট আবেদনপত্র, অর্থ লেনদেনের নথি কিংবা মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা নিশ্চিত করে এমন স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
ঢাকা মেট্রো-৪ সার্কেল কার্যালয়কে ঘিরে ওঠা অভিযোগের মধ্যে যানবাহনের ফিটনেস যাচাইয়ের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। অভিযোগ রয়েছে, সড়কে চলাচলের অনুপযোগী, অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গমনকারী কিংবা ব্রেক ও লাইটিং ব্যবস্থায় ত্রুটিযুক্ত কিছু যানবাহনও অর্থের বিনিময়ে ফিটনেস সনদ পেয়ে থাকতে পারে।
অভিযোগটি সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়মের বিষয় থাকবে না; সড়কে চলাচলকারী মানুষের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কারণ, ফিটনেস সনদ প্রদানের মূল উদ্দেশ্য হলো যানবাহনের কারিগরি অবস্থা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্ত যাচাই করা।
তবে এ অভিযোগের সমর্থনে নির্দিষ্ট কোনো যানবাহনের নিবন্ধন নম্বর, কারিগরি পরীক্ষার প্রতিবেদন, ত্রুটি শনাক্তকরণের নথি কিংবা সনদ প্রদানের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। তাই অনুপযুক্ত যানবাহনকে অর্থের বিনিময়ে ফিটনেস সনদ দেওয়ার অভিযোগ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
বিষয়টি যাচাই করতে অভিযোগের সময়সীমায় ফিটনেস সনদ পাওয়া যানবাহনের নথি নমুনাভিত্তিতে পরীক্ষা করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট পরিদর্শন প্রতিবেদন, ত্রুটির রেকর্ড, পুনঃপরিদর্শনের তথ্য এবং সনদ অনুমোদনের নথি পর্যালোচনা করলে অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে নির্ধারিত কারিগরি পরীক্ষা যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
সরকারি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফি, আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমা এবং কর্মকর্তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকার কথা। কোনো কর্মকর্তা কিংবা মধ্যস্থতাকারীর বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে অবৈধ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় যাচাই করা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের বক্তব্য সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট আবেদন ও সনদের নথি পরীক্ষা, অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই এবং কার্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
অভিযোগের ধরন ও প্রমাণের ভিত্তিতে প্রযোজ্য আইন এবং প্রশাসনিক বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নও আসতে পারে। তবে অভিযোগ ওঠা এবং অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তাই তদন্তের আগে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা সমীচীন নয়।
সেবাপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়াতে আবেদন গ্রহণ থেকে সনদ প্রদান পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের রেকর্ড সংরক্ষণ, সরকারি ফি ও সেবার নিয়ম সহজে দৃশ্যমান স্থানে প্রকাশ এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে বিআরটিএ ঢাকা মেট্রো-৪ সার্কেল কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ আলী আহসান মিলনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য, কার্যালয় কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা এবং বিআরটিএর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অবস্থান পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও পূর্ণাঙ্গভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।