বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের সংক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। টিকাদানের হার বাড়ানোর উদ্যোগ চললেও চলতি বছরের প্রাদুর্ভাব ২০০৫ সালের পর সবচেয়ে প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হাম বা এর উপসর্গে মারা গেছেন ১ হাজার ৪৪ জন। আক্রান্তদের বড় একটি অংশ দুই বছরের কম বয়সী শিশু, যাদের অনেকে প্রয়োজনীয় টিকা পায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঠপর্যায়ে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায় রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং টিকা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত জ্বর, সর্দি-কাশি ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিলেও গুরুতর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া বা মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যাপক টিকাদান। কোনো জনগোষ্ঠীতে প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষের টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসে।
একসময় বাংলাদেশে নিয়মিত টিকাদানের হার ছিল বেশ ভালো। ২০১৯ সালে হামের টিকার প্রথম ডোজ নেওয়ার হার প্রায় ৯৭ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার হার ৯৩ শতাংশ ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কারণে এই ব্যবস্থায় ঘাটতি তৈরি হয়।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হয়। এরপর টিকা সরবরাহ, স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নে নানা সমস্যার প্রভাব পড়ে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
২০২৫ সালে দেশে হামের টিকা নেওয়ার হার প্রায় ৮৬ শতাংশে নেমে আসে। ইউনিসেফের এক মূল্যায়নে দেখা যায়, প্রায় চার লাখ শিশু প্রয়োজনীয় সব টিকা পায়নি। এর মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার শিশু কোনো টিকাই পায়নি।
টিকাদানের ঘাটতির সঙ্গে অপুষ্টি, ঘনবসতিপূর্ণ শহর এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের হার তুলনামূলক ভালো দেখালেও নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় বড় সংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থাকতে পারে। এসব এলাকায় হঠাৎ করে ব্যাপক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি।
এপ্রিল থেকে বাংলাদেশে বড় পরিসরে হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়। এতে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এরপর সংক্রমণ কমার কিছু লক্ষণ দেখা গেলেও সব এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতি সমান নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই; আক্রান্ত হলে মূলত উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। তাই সংক্রমণ ঠেকাতে টিকাদানই সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা।
স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি যেসব এলাকায় টিকা না নেওয়া শিশুর সংখ্যা বেশি, সেসব এলাকায় বিশেষ নজর দিতে হবে। প্রত্যন্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে টিকা পৌঁছে দেওয়া এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, টিকাদানের ব্যবস্থায় আবারও বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হলে ভবিষ্যতে হামের আরও বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।