কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনকে (১৩) হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার সিএনজিচালক মো. সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিহতের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে। ফোনের কললিস্ট, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে একই দিন বিকেলে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের আইফোন উদ্ধার করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, ফোনটির প্রতি লোভ হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য একটি কারণ হতে পারে। তবে হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তাজমিন। পরিবারের সদস্যদের সে জানিয়েছিল, বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে যাচ্ছে। পরে মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানতে পারে, ওই দিন সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গিয়েছিল। পরদিন কুমিল্লায় ফিরে আবার কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়ে রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে তাজমিন। ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজে তাকে গাড়ি থেকে একা নামতে দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ক্যামেরার ফুটেজে তার হাতে মোবাইল ফোন ও কাঁধে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ দেখা গেলেও একপর্যায়ে তার গতিবিধি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার মতো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রেসকোর্স এলাকার বাসায় ফেরার জন্য তাজমিন একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠে। চালক সুমন তার হাতে থাকা আইফোন দেখতে পান বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এরপর অটোরিকশাটি নির্ধারিত পথের পরিবর্তে অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামের একটি ফসলি জমি থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের পাশ থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাও জব্দ করে পুলিশ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ঘটনাস্থলের আশপাশে ধস্তাধস্তি ও দৌড়াদৌড়ির আলামত দেখতে পান তাঁরা। পরে ধানক্ষেতে মরদেহ দেখতে পেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। অটোরিকশাটির নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে এর মালিক হিসেবে আবুল হাসেমকে শনাক্ত করা হয়। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের পর জানা যায়, গাড়িটি ভাড়ায় চালাতেন সুমন।
পরে অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার বাসিন্দা। কয়েক বছর আগে বিয়ের পর লালমাই উপজেলার জয়নগর এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস শুরু করেন বলে জানা গেছে।
তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, তাজমিন কেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে গিয়েছিল, সেখানে কারও সঙ্গে দেখা করেছিল কি না এবং কুমিল্লায় ফেরার পর কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল কি না। হত্যাকাণ্ডে সুমন ছাড়া অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, তা-ও যাচাই করা হচ্ছে।
এ ছাড়া হত্যার আগে তাজমিন ধর্ষণের শিকার হয়েছিল কি না, তা মেডিকেল প্রতিবেদনের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে। ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার তার মরদেহ যশোরের গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, উদ্ধার হওয়া আইফোনের তথ্য, কললিস্ট, সিসিটিভি ফুটেজ এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। শনিবার সকাল ১০টায় সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানোর কথা রয়েছে।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও ঘটনার পূর্ণ বিবরণ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। উদ্ধার হওয়া আইফোনের তথ্য বিশ্লেষণ ও অন্যান্য আলামত যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে বলে আশা করছে পুলিশ।