বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে ভারসাম্যপূর্ণ উল্লেখ করে দেশটির কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ইরান উদ্বিগ্ন নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি। তিনি বলেছেন, ইরান ‘মক্কা চুক্তি’কে নিজেদের বিরুদ্ধে কোনো উদ্যোগ হিসেবে দেখছে না।
বুধবার সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন ইরানের রাষ্ট্রদূত।
জালিল রাহিমির মতে, মক্কা চুক্তি মূলত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতার একটি প্রতিফলন। তিনি বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের কোনো বিরোধ নেই। তুরস্ক ও পাকিস্তান ইরানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং সৌদি আরবের সঙ্গেও তেহরানের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ফলে মক্কা চুক্তি নিয়ে ইরানের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রদূত বলেন, ইরান কোনো আরব দেশের ভূখণ্ডকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়নি। তাঁর দাবি, আরব দেশগুলোতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতেই ইরানি হামলা চালানো হয়েছে।
মক্কা চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট উদ্যোগ হিসেবে দেখার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জালিল রাহিমি তা নাকচ করেন। তাঁর ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ও মিত্রদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। তাঁর মতে, এ পরিস্থিতিতেই মক্কা চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে সামরিক ঘাঁটির জন্য জায়গা দেওয়া এবং মার্কিন অস্ত্র কেনার বিনিময়ে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা বলে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু মার্কিন অস্ত্র ও সামরিক উপস্থিতি কোনো দেশের প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না—এমনটাই দাবি তাঁর।
জালিল রাহিমি আরও বলেন, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন আসেনি এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাও বহাল রয়েছে। তাঁর দাবি, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ইরানের হামলা হয়েছে।
তাঁর মতে, মক্কা চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ব্যর্থতারই একটি অংশ। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুনভাবে ভাবছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ কারণে ইরান চুক্তিটিকে নিজেদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে না বলে জানান রাষ্ট্রদূত।
মক্কা চুক্তিতে ইরানের যোগ দেওয়ার কোনো উদ্যোগ রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইরান নিজ থেকে সদস্য হওয়ার কোনো প্রস্তাব দেয়নি। তবে চুক্তির সদস্যদেশগুলো ইরানকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানালে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
রাষ্ট্রদূত জানান, প্রায় এক দশক আগে ইরান মধ্যপ্রাচ্যকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিল। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। তাঁর দাবি, সে সময় যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশ এসব উদ্যোগে সমর্থন দেয়নি।
বর্তমান পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে জালিল রাহিমি সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানের মতো দেশগুলোর উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন—যুক্তরাষ্ট্র কি তাদের প্রত্যাশিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছে?
তিনি আরও প্রশ্ন করেন, ওই দেশগুলোর আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের দিকে যাওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্র সেগুলো প্রতিহত করতে পেরেছে কি না। এসব উদাহরণ দিয়ে তিনি দাবি করেন, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিয়ে দেশগুলোর নতুন করে চিন্তা করার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।